জেলা প্রতিনিধি | শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 0 বার পঠিত

বাবা ও ছোট ভাইকে ক্যানসারে হারিয়েছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক সংকট আর পরিবারের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার আরিফ। অর্থাভাবে থেমে গেছে পড়াশোনা। অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার পাশাপাশি সামলাতে হচ্ছে নিজের সংসার। স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। তবু মানুষের কাছে হাত পাততে নারাজ তিনি। কসবা বাজারে ছোট্ট একটি দোকানে মোবাইলের সরঞ্জাম বিক্রি ও ওজন মেপে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। এখন সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসাটি বড় করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে আরিফ। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও পারিবারিক শোক ও আর্থিক সংকটে শেষ পর্যন্ত শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে পারেননি।
ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু এবং ২০২৪ সালে বাবাকে হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন আরিফ। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক দায়িত্বও বেড়ে যায়। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে নেন তিনি।
ছোট্ট ব্যবসাই বেঁচে থাকার অবলম্বন
২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে উপার্জন শুরু করেন আরিফ। পরে পরিবারের খরচ মেটাতে কসবা বাজারে একটি ছোট স্টলে ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে মোবাইলের কাভার, হেডফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। পাশাপাশি পথচারীদের ওজন মেপেও কিছু টাকা আয় করেন।
কিন্তু পণ্যের চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে পারছেন না তিনি। ফলে বাড়ছে না বিক্রি, উন্নতি হচ্ছে না ব্যবসারও। একদিকে অসুস্থ মা, অন্যদিকে নিজের সংসারের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই অভাবের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে তাকে।
এর মধ্যে স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। অনাগত সন্তানকে ঘিরে স্বপ্ন থাকলেও আর্থিক অনটন সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা’—কটাক্ষেও দমেননি
আরিফের কাছে ছোট্ট দোকানটি শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বনও। অনেকেই তাকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা?’ কিন্তু এসব কথায় দমে যাননি তিনি। নিজের শ্রমে উপার্জন করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কসবা বাজারের ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের কাছেও আরিফের জীবনসংগ্রাম পরিচিত। তার পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রশংসা করেন তারা। পাশাপাশি তার ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘আমি আরিফের কাছ থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে। আমরা চাই, সরকারিভাবে যেন তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।’
আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, ‘তার বাবা নেই, মা আছেন। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন, কিন্তু সেটা না করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।’
আরিফের দীর্ঘদিনের এক সহকর্মী ব্যবসায়ী জানান, প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি আরিফের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার তার জন্য কোনো চাকরির ব্যবস্থা করলে তিনি কাজ করে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন ওই ব্যবসায়ী।
পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, ‘আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে নিজের শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। সরকার তাকে সহায়তা করলে ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারত।’
সামান্য পুঁজিতে ব্যবসা বড় করার স্বপ্ন
নিজের সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আরিফ বলেন, ‘আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করি। আমার পরিবার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসাটি শুরু করেছি।’
তিনি বলেন, ‘পণ্যের চাহিদা থাকলেও নানা আর্থিক সংকটের কারণে ব্যবসাটি সেভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই সহযোগিতা করেছেন, তবে সরকারিভাবে এখনো কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি সরকার ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছে আবেদন করছি, আমার এই ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য সামান্য কিছু হলেও অনুদান দিন। আমার মা অসুস্থ এবং স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা।’
ব্যবসার প্রতি আগ্রহের কথা তুলে ধরে আরিফ জানান, ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু আর্থিক সমস্যা এবং ছোট ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর মানসিক চাপ বেড়ে যায়। পরে ২০২৪ সালে তার বাবাও ক্যানসারে মারা যান। মানসিক চাপ ও আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি।
জীবিকার জন্য ভিক্ষার পথ বেছে না নেওয়ার কারণ জানিয়ে আরিফ বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।’
প্রয়োজন মানবিক সহায়তা
আরিফের চাওয়া খুব বেশি নয়। নিজের ব্যবসা বড় করা, প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বিক্রি বাড়ানো এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে চান তিনি। সামান্য পুঁজি কিংবা সরকারি সহায়তা পেলে ব্যবসাটি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা তার জন্য সহজ হবে বলে আশা করছেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আরিফের মতো পরিশ্রমী একজন মানুষ যেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের কারণে পিছিয়ে না পড়েন। তার যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসাটি সম্প্রসারণে সহায়তা করা গেলে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আরও একটি সুযোগ পাবেন।
কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট একটি দোকানে প্রতিদিন জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফ। বাবা ও ভাইকে হারানোর শোক, থেমে যাওয়া পড়াশোনা কিংবা অভাব—কোনোটিই তাকে পরিশ্রমের পথ থেকে সরাতে পারেনি। মানুষের কাছে হাত পেতে নয়, নিজের শ্রমে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চান তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণে এখন প্রয়োজন সামান্য পুঁজি, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও মানবিক সহযোগিতা।
Posted ৭:১০ এএম | শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।