নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | 331 বার পঠিত

রাশিয়ার হাইব্রিড বাগ্যুদ্ধ যতই ইউরোপীয় রাজধানীগুলোর কাছাকাছি আসছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার ধরন নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে ততই ব্যর্থ হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। অন্তত কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত ইইউর এলোমেলো শীর্ষ সম্মেলনটি এমন উদ্বেগজনক ধারণাই দেয়। গত সপ্তাহে ইউরোপীয়দের পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত করার জন্য শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলোর ব্যাপারে ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে সম্মেলনটি হয়।
সম্মেলনটি তীব্র বিতর্ক, রাজনৈতিক দলাদলি ও গুপ্ত এজেন্ডার বিব্রতকর প্রদর্শনী হয়ে উঠেছিল, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। নেতারা ইউরোপের সামরিক পুনর্গঠনের দায়িত্বে কার থাকা উচিত– তাতেই বিতর্ক সীমিত রাখেননি; বরং রাশিয়ান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ চালিয়ে নিতে কীভাবে অর্থায়ন এবং ইইউ সদস্যপদ অর্জনের জন্য কিয়েভের প্রচেষ্টা কীভাবে ফলপ্রসূ করা যায়, তা নিয়েও বিতর্ক উঠেছিল।
ইউরোপীয় বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর গুনগুন করা ড্রোন এবং রাশিয়ান যুদ্ধবিমান বারবার তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এসব ঘটনায় তারা উদ্বেগ জানিয়েছেন, তবে কীভাবে তার জবাব দেওয়া হবে তা তারা ঠিক করতে পারেননি। তাদের গুলি করে ভূপাতিত করা হবে? তাড়িয়ে দেওয়া হবে, নাকি শান্ত থেকে তা চলতে দেওয়া হবে? কিংবা রাশিয়ান সম্পদ জব্দ করে তা ইউক্রেনকে বিশাল ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে? মস্কোর তেল-গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করার জন্য আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, নাকি রাশিয়ার আরও ভেতরে গিয়ে আঘাত করার জন্য কিয়েভকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে প্রতিশোধ নিতে হবে? কোপেনহেগেনে এর কোনোটার ব্যাপারেই ঐকমত্য তৈরি হয়নি। অথচ এ ব্যাপারে শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
ডেনমার্কের রাজধানীতে এসব কোলাহল দেখে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিশ্চয় হাসছেন। তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন, তাঁর ক্রমবর্ধমান উস্কানিতে ইউরোপ দুর্বল ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এটি সব পক্ষের জন্যই বিপজ্জনক হবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন পূর্ব ইউরোপের জন্য বহুস্তরীয় ড্রোন প্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু ইইউর বড় শক্তিগুলো অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলনে তা নাকচ করে দেয়।
ভন ডের লেইন নেতাদের কাছে একটি কাগজ বিতরণ করেন, যেখানে ইউরোপের জন্য সর্বোত্তম এক প্রতিরক্ষা প্রকল্প-সংক্রান্ত চারটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে ছিল– একটি ইউরোপীয় ড্রোন প্রাচীর, পূর্বাঞ্চলে আচমকা আক্রমণ ঠেকাতে একটি নজরদারি নেটওয়ার্ক, একটি বিমান প্রতিরক্ষা ঢাল, আরেকটি প্রতিরক্ষা মহাকাশ ঢাল। তিনি আরও বলেন, ইইউ নির্বাহীরা নতুন প্রতিবেদন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রস্তুতি বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সদস্য দেশগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ড্রোন প্রাচীরের ধারণাকে খারিজ করে দিয়ে বলেন, ‘আরও উন্নত ও জটিল’ কিছু প্রয়োজন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরজ ব্রাসেলসের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের নিন্দা জানান এবং বন্ধ দরজার আড়ালে ড্রোনবিরোধী পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি অভিযোগ করেন, ব্রাসেলসের মনোযোগ কেবল পূর্বের দেশগুলো রক্ষার ওপর নিবদ্ধ এবং দক্ষিণাঞ্চলকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর আপত্তির পক্ষে আরেকটি যুক্তি দিতে গিয়ে বলেন, এটি ন্যাটোর কাজ; ইইউর নয়।
বিতর্কটি ছিল ক্ষমতা নিয়ে; ড্রোন বিষয়ে নয়। জাতীয় নেতারা প্রতিরক্ষা উদ্যোগের নামে কমিশন ক্ষমতা দখল করতে চায়, এমন সন্দেহও পোষণ করেন। তারা ভন ডের লেইনকে তাঁর মূল কাজে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। ব্রাসেলসের পক্ষ থেকে সদস্য দেশগুলোকে সহযোগিতামূলক প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাবদ ১৫০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ হিসেবে দান এবং প্রতিরক্ষার জন্য আরও ঘাটতি ব্যয়ের অনুমতি দিতে নিয়ম শিথিল করার প্রস্তাবটা ছিল চমৎকার। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় দেশগুলো নিজেদের হাতে নিয়ন্ত্রণ রেখে দিতে চায়। এসব দেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের ন্যাটো বাহিনীর প্রয়োজনীয় শর্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য বিভিন্নভাবে সক্ষমতার বিকাশ ঘটাচ্ছে।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য ফ্রাঙ্কো-ব্রিটিশ নেতৃত্বে কাজ করা ‘আগ্রহীদের জোট’ ইউরোপের পুনরায় অস্ত্র সজ্জিতকরণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু এর মূল সদস্যদের মধ্যে অস্ত্র তৈরির কারখানা-বিষয়ক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এসব বিরোধের মূলে রয়েছে ইউরোপীয়দের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব, যা ট্রাম্পের আমলে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। বিশেষত এর কারণ ইউরোপীয় নিরাপত্তার প্রতি মার্কিন অঙ্গীকারের অনিশ্চয়তা। যখন দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থার বিষয়টি নিশ্চিত নয়, তখন তাদের প্রবৃত্তি হলো দেশের অস্ত্রশিল্প ও সামরিক বাহিনীকে পিছিয়ে দেওয়া। এটি এমন এক সময়ে ইউরোপকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যখন রাশিয়ার ব্যাপারে তাদের শক্তি ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করা প্রয়োজন। ইউরোপীয় নেতাদের কমিশনকে বলির পাঁঠা বানানো বন্ধ করতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে একসঙ্গে বসতে হবে যেন ইউরোপ আক্রমণের মুখে পড়েছে। আর এটি সংগত।
Posted ৫:১১ পিএম | বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Best BD IT
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।