নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | 361 বার পঠিত

এ বছরের গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের সংশোধিত খসড়ায় ‘না ভোট’ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তবে সেটি কেবল একক প্রার্থীর আসনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ কোনো নির্বাচনী আসনে বৈধভাবে একজন প্রার্থী থাকলে ভোটার ব্যালটে ‘না ভোট’ দিতে পারবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার যদি ‘না ভোট’ দেন, তাহলে নির্বাচন বাতিল বলে গণ্য এবং পুনরায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
আপাত দৃষ্টিতে এই বিধান ইতিবাচক মনে হলেও এর প্রয়োগক্ষেত্র সীমিত হওয়ায় এটি গণতন্ত্রের মূল চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ ভোট কেবল পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করার বিষয় নয়; একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য বা অনুপযুক্ত প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করার অধিকারও। গণতন্ত্রে ভোটের দুটি দিক– ‘সমর্থন ও প্রত্যাখ্যান’ দুটিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রস্তাবিত বিধানটি ভোটারের সেই দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে সীমিত করে ফেলেছে।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ‘না ভোট’ চালু করা হয়েছিল। ব্যালট পেপারে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল– ‘না ভোট’। অর্থাৎ কোনো প্রার্থীই পছন্দ না হলে ভোটার তাঁর অসন্তোষ বা মতামত জানাতে পারতেন। তবে ২০০৯ সালে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে এই বিধানটি বাতিল করে দেয়।
‘না ভোট’ ব্যবস্থাটি থাকলে দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে পারে। তারা বুঝতে পারে, জনআস্থা ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে ভোটারের সমর্থন মিলবে না। বর্তমান প্রস্তাব অনুসারে একাধিক প্রার্থী থাকলে ‘না ভোট’ দেওয়া যাবে না– এই সীমাবদ্ধতা মূলত প্রস্তাবিত আইনের একটি বড় দুর্বলতা। বাস্তবে অনেক সময় প্রার্থী থাকলেও ভোটার মনে করতে পারেন, মনোনীত কাউকেই আস্থায় নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে ভোট দিতে না গিয়ে তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকেই বিরত থাকতে পারেন। এভাবে ভোটারবিমুখতা বাড়তে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যদি ‘না ভোট’ উন্মুক্ত থাকে, তাহলে আশা করা যায় সব ভোটার কেন্দ্রে যাবেন। কারণ তিনি জানবেন– অসন্তোষ বা আস্থাহীনতা জানাতেও ভোট দেওয়া যায়।
অনেক গণতান্ত্রিক দেশে এ নীতি ইতোমধ্যে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ভারত, সুইডেন, ব্রাজিল, চিলি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও না ভোটের বিধান রয়েছে। এসব দেশে এই বিধান ভোটারের আগ্রহ বাড়িয়েছে; প্রার্থী নির্বাচনে দলগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক করেছে এবং নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক কমিয়েছে বলে মনে করা হয়।
বাংলাদেশে এই ধারণা আরও প্রাসঙ্গিক। গত কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে, ভোটারদের বড় একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে সেটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে; অনেক সময় মানুষের মনে গভীর হতাশা থেকেও ‘কাউকেই পছন্দ হচ্ছে না’। এই হতাশা থেকে বেরিয়ে আসার গণতান্ত্রিক উপায় হতে পারে ‘না ভোট’। এটি কোনো বিশৃঙ্খলা নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ; যেখানে ভোটার তাঁর অনাস্থা ব্যক্ত করছেন প্রার্থীর প্রতি; রাষ্ট্র বা গণতন্ত্রের প্রতি নয়।
‘না ভোট’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনকে ব্যালট পেপারে ‘না ভোট’ বিকল্পটি স্পষ্টভাবে যুক্ত করতে হবে, গণনায় স্বচ্ছতা রাখতে হবে এবং ফলাফল বিশ্লেষণের জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করতে হবে। যেমন– কত শতাংশ ‘না ভোট’ পড়লে পুনর্নির্বাচন হবে। অথবা এটি প্রার্থীর বৈধতাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে– এসব প্রশ্নের আইনি ব্যাখ্যা জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও ভূমিকা থাকবে; জনগণকে বোঝাতে হবে, ‘না ভোট’ কোনো নেতিবাচক কাজ নয়; এটি নাগরিক অধিকারচর্চারই একটি রূপ।
‘না ভোট’ জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতীক, যা ভোটারকে সমর্থনের পাশাপাশি অসন্তোষ প্রকাশেরও অধিকার দেয়। এটি রাজনৈতিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। অতএব, কেবল একক প্রার্থী নয়, সব আসনেই ‘না ভোট’-এর সুযোগ থাকা উচিত।
Posted ৩:০১ পিএম | বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Best BD IT
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।