ডেস্ক রিপোর্ট | মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | 6 বার পঠিত

যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। সর্বশেষ জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে থাকায় প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে রিপাবলিকানরা। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দলের মধ্যে চলছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। মূল্যস্ফীতির হার কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম এখনো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতির জন্য অনেক ভোটার ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে দায়ী করছেন। বিশেষ করে শুল্কনীতি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে তাঁদের ধারণা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতি নিয়ে নাগরিকদের অসন্তোষ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকে ইতিবাচক চিত্র রয়েছে। বেকারত্বের হার ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কর্মসংস্থানে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগ শেয়ারবাজারের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। এতে অনেক মার্কিন নাগরিকের অবসরকালীন সঞ্চয় বেড়েছে।
তবে অর্থনীতির এসব ইতিবাচক সূচক সাধারণ মানুষের অসন্তোষ দূর করতে পারছে না। কয়েক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্য ও সেবার দাম এখনো অনেক বেশি। ফলে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। জরিপে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে অর্থনীতি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মনোভাবের অবনতি হয়েছে।
ট্রাম্প নিজে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও তাঁর অর্থনৈতিক নীতি ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে ভোটারদের একটি বড় অংশের মধ্যে বিরক্তি ও হতাশা রয়েছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে শেষ মুহূর্তের প্রচার
নির্বাচনের আগের দিন সোমবারও প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা। জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার আভাস তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শেষ মুহূর্তের প্রচারে ভোটারদের সমর্থন আদায় করে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই ছিল রিপাবলিকানদের মূল লক্ষ্য।
ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুল এলাকায় প্রচার চালান ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীকে নতুনভাবে সাজানোর উচ্চাভিলাষী ও বিতর্কিত পরিকল্পনার কারণে স্থানটির সঙ্গে তাঁর বিশেষ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা তৈরি হয়েছে।
এর আগে রোববার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জিততে যাচ্ছি।’ ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, দলটি ক্ষমতায় এলে সাধারণ পরিবারগুলোকে দেউলিয়া করে দেবে।
অন্যদিকে, নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে প্রচারে সক্রিয় ছিলেন ডেমোক্র্যাট নেতারাও। টেক্সাসে দলটির সিনেট প্রার্থী জেমস টালারিকো এবং কানসাসের প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচার শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর শঙ্কা
সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে রিপাবলিকানরা। অন্যদিকে, বর্তমানে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে। কেন্দ্রীয় বাজেটের ওপর ভোট দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ পাবে বিরোধী দল। এর ফলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ, এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের সুযোগ তৈরি হবে।
কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ট্রাম্পকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। মূল্যস্ফীতির চাপ, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অচলাবস্থা এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্ত—সব মিলিয়ে তাঁর প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছর রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সিনেটের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাত অঙ্গরাজ্য
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি অঙ্গরাজ্যের অধিকাংশেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন বলে জনমত জরিপে উঠে এসেছে। টেক্সাস ও কানসাসে দলটির প্রার্থীদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। ঐতিহাসিকভাবে এই দুই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট নির্বাচনে সাফল্যও বিরল। টেক্সাসে সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে এবং কানসাসে ১৯৩২ সালে ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের বর্তমান আসনগুলো ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের দখলে থাকা অন্তত চারটি আসনে জয় পেতে হবে।
কানসাস, মেইন, ওহাইও ও টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। আলাস্কায় ব্যবধান সামান্য। অন্যদিকে, আইওয়ায় দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা মিশিগানেও দলটির প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ প্রায় দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
তবে মিশিগানের জরিপটি করা হয়েছিল দলটির অভ্যন্তরীণ বিভেদ প্রকাশ্যে আসার আগে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্সের রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণার পর নির্বাচনী পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে
মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের দিন ভোটসংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নিয়ে কয়েক দশকের প্রচলিত রীতির ব্যত্যয় ঘটিয়েছে বিভাগটি।
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট বাতিলের আবেদন জানিয়েছে বিচার বিভাগ। তাদের অভিযোগ, এসব ভোটারের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। ফলে তাঁদের ভোট দেওয়ার আইনগত অধিকার নেই।
এ ঘটনায় চলমান একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও চেয়েছে বিভাগটি। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত করার এখতিয়ার বিচার বিভাগের নেই বলেও দাবি করেছে রাজ্য প্রশাসন।
এদিকে, আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সালিভানের সঙ্গে একই নামের একজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ওই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে ফৌজদারি তদন্ত জোরদার করেছে বিচার বিভাগ।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট নেত্রীর অবস্থান পরিবর্তনে আলোচনা
মিশিগানের সিনেট নির্বাচন ঘিরে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্স। দলীয় প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
এর আগে এল-সায়েদের বক্তব্যের প্রশংসা করে বিবৃতি দিয়েছিলেন স্টিভেন্স। প্রাইমারি নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এল-সায়েদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারেন—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও তিনি বারবার তা নাকচ করেছিলেন।
গত সপ্তাহে তাঁর কয়েকজন সহযোগী রজার্সকে সমর্থন না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে যোগাযোগ করেন। তাঁদের একজনকে খুদে বার্তায় স্টিভেন্স লিখেছিলেন, ‘আপনারা কেন ভাবছেন যে আমি এমনটা করব?’
গত শনিবার মধ্যরাতেও নিজের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্রকে তিনি জানিয়েছিলেন, এল-সায়েদের প্রতিই তাঁর সমর্থন বহাল থাকবে। কিন্তু পরদিন সকালে অবস্থান পরিবর্তন করেন এই ডেমোক্র্যাট নেত্রী। সাংবাদিকদের কাছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে রজার্সকে সমর্থনের ঘোষণা দেন।
স্টিভেন্সের আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন মিশিগানের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর সমর্থন রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সের পক্ষে ভোটের সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ।
Posted ৬:০৬ এএম | মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।