মঙ্গলবার ১৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

পদাতিকের বাড়ালো জোর, ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’

বিনোদন ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   69 বার পঠিত

পদাতিকের বাড়ালো জোর, ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’

বাংলায় একটা কথা আছে, ‘পুরান চাল ভাতে বাড়ে’। কথাটা চাল নিয়ে চালু থাকলেও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও চলে। বিশেষ করে নাটকের ক্ষেত্রে তো বটেই। সেজন্যই আমরা বারবার মঞ্চে দেখতে পাই, পুরোনো দিনের গল্প-কাহিনি। আসলেই কি সেগুলো পুরোনো? মোটেও নয়। ধরুন, আমাদের মৈমনসিংহ গীতিকা’র কথা কিংবা আরব্য রজনীর কথা। শত শত বছর পার করেও এসব আখ্যান পুরোনো হয় না। এসব আখ্যানের মাঝে থাকে চিরন্তন এক আবেগ-অনুভূতি। এসবের দর্শকপ্রিয়তা কোনোকালেই কমে না। যে কোনো সময়ের উপযোগী করে এসব গল্প বলতে পারলে, সৃজনশীলতায় নতুনত্ব নিয়ে আসতে পারলে কে আর আটকাতে পারে এসব আখ্যানের জনপ্রিয়তা?

এ বছরের শেষের দিকে পদাতিক নাট্য সংসদ (টিএসসি) মঞ্চে নিয়ে আসে ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’। এটি যে আরব্য রজনীর গল্প তা সবারই জানা। এখানে বলে রাখা ভালো, শিরি-ফরহাদ, লাইলি-মজনু, সোহরাব-রুস্তম এসব আখ্যান পারস্যের হলেও অনেকেই আরব্য রজনীর কাহিনি বলে চালিয়ে দেন। যেমনটা হয়, মৈমনসিংহ গীতিকা’র ক্ষেত্রেও। কাছাকাছি ধরনের অনেক গল্প প্রচলিত আছে মৈমনসিংহ গীতিকা’র নামে, যা আদৌ মৈমনসিংহ গীতিকা’য় নেই। দায়িত্বশীল কেউ অবশ্য এ কাজ করতে পারেন না। পদাতিক মৈমনসিংহ গীতিকা’র ‘চন্দ্রাবতী’ পালা নিয়ে কাজ করেছে অনেক আগে। তাদের সে প্রযোজনাও খ্যাতি অর্জন করেছিল। এবার তারা মঞ্চে নিয়ে এলো আরব্য রজনীর গল্প ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’।

‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ অত্যন্ত জনপ্রিয় আখ্যান। এ কাহিনি নিয়ে নাটক, চলচ্চিত্র, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্যও হয়েছে অনেক। আমরাতো ছোটবেলায়ই পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম আবদুল্লাহ ও মর্জিনার সঙ্গে। গুন গুন করে গেয়েও উঠেছি কখনো-সখনো- ‘না না মর্জিনা, তার চেয়ে তুই বল, ছিঁ ছিঁ এত্তা জঞ্জাল’। জনপ্রিয় কাহিনি হওয়ায় ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ নিয়ে জঞ্জালও কম হয়নি। তাহলে সুদীপ চক্রবর্তী কেন এই সময়ে এসে এই গল্প বেছে নিলেন মঞ্চায়নের জন্য? তবে কি জঞ্জাল বিদায় করার চেষ্টা করেছেন সুদীপ পদাতিক বাহিনী নিয়ে? ‘মার ঝাড়– মার, ঝাড়– মেরে ঝেটিয়ে বিদায় কর/ যত আছে নোংরা সবই ঠ্যাংড়া মেরে/ ঘর থেকে দূর কর’ এই জনপ্রিয় গানটি ব্যবহার না করেও তিনি বিদায় করেছেন যতসব নোংরা, পুরোনো ঠ্যাংড়া চিন্তা-চেতনা। এখানেই সুদীপের আধুনিকতা, গল্প বলার সময়োপযোগিতা নির্মাণ করা।

‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’-এর গল্প সবারই জানা। নতুন করে সে গল্প বলে সময় নষ্ট করা অবান্তর। জানা গল্পেই নাটক শেষে সুদীপ চক্রবর্তী টুইস্ট সৃষ্টি করেছেন। এখানেই তাঁর অনন্যতা। আমরা জানি, মূল গল্পে মর্জিনার কৌশলে চল্লিশ চোর ধরা পড়ে এবং তাদের শরীরে গরম তেল ঢেলে দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়। শাস্তির এই বিধানটি আজকের দিনে বড্ড বেমানান, অমানবিক। তাই সুদীপ নাটকের শেষে এসে ন্যায়বিচারের কথা যেমন উল্লেখ করেছেন, তেমনি মৃত্যুদণ্ডের মতো অমানবিক বিষয়টি রহিত হওয়ারও আশা প্রকাশ করেছেন। আরব্য রজনীর গল্পের কাঠামোর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে তিনি আইন, বিচার ও মানবিকতার মানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকতাকে স্পর্শ করার আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা জানি, গণতন্ত্রহীন দেশগুলোতে আইন ও বিচার ব্যবস্থা ক্ষমতাসীনদের একটি মোক্ষম অস্ত্র। যে যখন ক্ষমতায় থাকে সে প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে। ফলে মানবিকতা, বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা ভূলুণ্ঠিত হয়। তাই ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ হয়ে ওঠে বর্তমান সময়ের নাটক, মানবিকতাবোধের নাটক।

‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ সংগীতপ্রধান নাটক। এ নাটকে বর্তমান সময়ে বহুল চর্চিত কাওয়ালির ব্যবহার ছিল প্রচুর পরিমাণে, যা দর্শককে পুরো নাটকজুড়ে উতুঙ্গ অবস্থায় রাখতে সাহায্য করেছে। খুব সাধারণ সেট হলেও তার ব্যবহার ছিল আকর্ষণীয়। উজ্জ্বল আলো, পোশাক, প্রপস নাটকটিকে চাঙ্গা রেখেছে। নাটকটি যেহেতু সংগীতপ্রধান, তাই সংগীত পরিকল্পনা করাটা ছিল চ্যালেঞ্জিং। সে ক্ষেত্রে রুদ্র সাওজাল কাব্য ও রাইসা হাসান তাদের পারঙ্গমতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। নাটকের কাহিনি বিন্যাস ও সংলাপ রচনায় তরুণ নাট্যকার উম্মে হানী দারুণ কাজ করেছেন। কখনও ছোট ছোট সংলাপ, তাতে তাল লয় ছন্দের ব্যবহার ও সময়ের সঙ্গে মিল রেখে শব্দ চয়ন ও সংলাপ নির্মাণ প্রশংসনীয়। সবশেষে বলতে হয় অভিনয়ের কথা। একটি নাটকে প্রাণ সঞ্চার করেন অভিনয়শিল্পীরা।

এ নাটকে অভিনয়শিল্পীর সংখ্যাটা বেশ বড়ই। বেশিসংখ্যক অভিনয়শিল্পী যুক্ত না করে এ নাটক পরিবেশন সম্ভব নয়। তবে সংখ্যায় বেশি অভিনয়শিল্পী থাকলে চ্যালেঞ্জটাও বেড়ে যায়। সব শিল্পী কাছাকাছি মানের অভিনয় না করলে সেটা খুব করে চোখে পড়ে। এ নাটকে দু-চারজন একটু পিছিয়ে থাকলেও পুরো টিম উতরে গেছে। বেশ কয়েকজন তো অসাধারণ অভিনয় দেখিয়েছেন। বিশেষ করে, সৈয়দা শামছি আরা সায়েকা, শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, জিয়াউল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, হাসিনা আক্তার নিপা, মোছাঃ জিনিয়া আজাদ প্রমুখের অভিনয় চমৎকার ও প্রাণবন্ত ছিল। নৃত্যদলে নুরুন্নাহার পাপিয়া, কামরুননেসা দোলন, নুসরাত জাহান বন্যা, বর্ষা ঘোষ, সবুজ খান, তপু চন্দ্র দাস, এস এম মিলন যথার্থ। দস্যু হিসেবে নূর-ই-আলম সবুজ, তন্ময় বিশ্বাসদের আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।

সবশেষে বলতে হয় ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সৃজনশীলতার সম্মিলনে পদাতিক নাট্য সংসদ ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’-এর মতো চমৎকার একটি প্রযোজনা দর্শকদের উপহার দিয়ে নিজের অবস্থান আবার সুদৃঢ় করল ঢাকার নাট্যাঙ্গনে।

Facebook Comments Box

Posted ১:০০ পিএম | বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

|

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

NSM Moyeenul Hasan Sajal

Editor & Publisher
Phone: +1(347)6598410
Email: protidinkar@gmail.com, editor@protidinkar.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।