ডেস্ক রিপোর্ট | বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | 4 বার পঠিত

কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো আগাম বার্তা না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ৭২ বছরের সামরিক জোটে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ও সিউলের পূর্বনির্ধারিত বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক বার্তায় মহড়ার পরিধি ও সময়সীমা কমিয়ে আনার নির্দেশ দেন তিনি। এতে কোরীয় উপদ্বীপজুড়ে নিরাপত্তা শঙ্কার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যৌথ নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও সিউলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রতিবছর অনুষ্ঠিত ১১ দিনব্যাপী ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নামের এই যৌথ সামরিক মহড়া নিয়ে ট্রাম্পের আকস্মিক নির্দেশে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্সেস কোরিয়ার কমান্ডার জেনারেল জেভিয়ার ব্রানসন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-বেক জরুরি বৈঠকে বসেন। সমঝোতা অনুযায়ী, নির্ধারিত ১১ দিনের পরিবর্তে মহড়া কমিয়ে পাঁচ দিনে নিয়ে আসা হয়েছে। পাশাপাশি ফিল্ড ট্রেনিং ও কৌশলগত অনুশীলনের বড় একটি অংশ বাতিল কিংবা সিমুলেশনে রূপান্তর করা হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, এ ধরনের যৌথ মহড়া উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের কাছে এক ধরনের উসকানিমূলক বার্তা পাঠায় এবং এতে অযথা খরচ বাড়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু উত্তর কোরিয়ার প্রতি নমনীয় হওয়ার ইচ্ছাই কাজ করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। ওভাল অফিসে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯ হাজার সেনা দক্ষিণ কোরিয়াকে কিম জং উনের সম্ভাব্য আগ্রাসন থেকে রক্ষা করছে, সেখানে ইরান অভিযানে ওয়াশিংটনকে সরাসরি সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সিউল। এতে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাসের চিত্র ফুটে উঠেছে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন স্বীকার করেন, ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ঘোষণার বিষয়ে তাঁদের আগে কোনো ধারণা বা আনুষ্ঠানিক তথ্য দেওয়া হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম শীর্ষ দৈনিক ‘হানকুক ইলবো’ এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন একক মনোভাবের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এখন বাস্তব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ওয়াশিংটন তার পুরোনো মিত্রকে পাশে না পেয়ে ক্ষুব্ধ, সেখানে উত্তর কোরিয়ার প্রতি ট্রাম্প আরও বেশি সমীহ প্রদর্শন করছেন। অন্যদিকে, দেশটির অন্যান্য রক্ষণশীল সংবাদপত্রগুলো সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রতার চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় তিনি একদিকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ওপর আস্থা রাখার কথা বলেন, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষায় স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। পরে তিনি ট্রাম্পের পদক্ষেপকে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রয়াস হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ওরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় ওয়াশিংটনকে সহায়তার ইঙ্গিত দেন।
তবে বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নীতি-নির্ধারকদের মতে, ১৯৭০-এর দশকের পর মার্কিন সামরিক ছায়াতলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা আগে কখনো দেখা যায়নি। ট্রাম্পের আকস্মিক ও অস্থিতিশীল সিদ্ধান্তের কারণে সিউলে নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি আবারও জোরালো হতে পারে।
১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে দক্ষিণ কোরিয়া। এখন দেশটি উপলব্ধি করছে, ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ নীতি ও একক স্বার্থের কারণে যেকোনো সময় যৌথ প্রতিরক্ষার শর্ত বদলে যেতে পারে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ঘিরে পুরো এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতি নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সূত্র: আল জাজিরার বিশ্লেষণ
Posted ৬:৩৩ এএম | বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।