নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 15 বার পঠিত

বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার এখন প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) পঞ্চমবারের মতো এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে একটি নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। জনগণের সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। এর অগ্রাধিকার হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করছি। একই সঙ্গে দেশকে একটি শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছি।’ উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ সব খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা জানান তিনি।
বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেবে।
সামাজিক সুরক্ষায় চার কার্ড
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অগ্রাধিকার পান। ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে।
এ ছাড়া ‘হেলথ কার্ড’-এর মাধ্যমে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এর প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন। পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষায় বিনামূল্যে নানা সুবিধা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু সনদের জন্য নয়, বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব বাড়ানো হবে। শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগও থাকবে।
সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে। প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী জাতীয় অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান প্রয়োজন।
ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
‘আমরা চাই আমাদের তরুণেরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল-জলপথ খনন
কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজার সংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদেরও সহায়তা দেওয়া হবে।
পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য
পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফাইড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তুলে বর্জ্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও হতে হবে মিয়ানমারেই।’
বঙ্গোপসাগর ঘিরে বিপুল সম্ভাবনা
বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতি পুরো বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে।
জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এমন একটি এলাকায় পরিণত হোক, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
Posted ৭:৪৭ এএম | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।