ডেস্ক রিপোর্ট | মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 1 বার পঠিত

গ্রিসে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ চাওয়া, দামি উপহার গ্রহণ এবং একটি গ্রিক নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের লবিস্টকে সরকারি বৈঠকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়া তার প্রথম সংবাদ ব্রিফিংয়ে গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, “আমরা রাষ্ট্রদূত গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছি।” একই সঙ্গে গিলফয়েলকে ট্রাম্পের দলের জন্য ‘দারুণ সম্পদ’ হিসেবে উল্লেখ করে তার ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য কামনা করেন তিনি।
তবে গিলফয়েলের আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, আগে সম্পন্ন করা বক্তৃতা ও পরামর্শকাজের পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন তিনি। উপহার গ্রহণ ও তা প্রকাশের ক্ষেত্রেও গিলফয়েল সরকারি বিধিবিধান মেনেছেন বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবীরা।
এক লাখ ডলার চাওয়ার অভিযোগ
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক দাতা এরিক ডিটার্স। তার দাবি, সিনেটে গিলফয়েলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার কয়েক দিন আগে তিনি তাকে একটি খুদে বার্তা পাঠিয়ে এক লাখ ডলার দেওয়ার অনুরোধ করেন।
ডিটার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অর্থ দিয়ে একটি আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন গিলফয়েল। অর্থ দিতে রাজি করানোর জন্য তিনি বলেছিলেন, এর বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনে ডিটার্সের ‘সুখে-দুঃখে পাশে থাকা বিশ্বস্ত সহযোগী’ হয়ে থাকবেন।
গত সপ্তাহে সিএনএনের সাংবাদিক জেক ট্যাপারকে ডিটার্স বলেন, “এটি যে বিনিময়-শর্তের সম্পর্ক ছিল, তা নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই।”
তবে ডিটার্স গিলফয়েলকে ওই অর্থ দেননি। তার দাবি, সে সময় তার হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা সহজে ব্যবহারযোগ্য সম্পদ ছিল না।
অন্যদিকে, গিলফয়েলের আইনজীবীরা সিএনএনকে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, বক্তৃতা ও পরামর্শকাজের জন্য ডিটার্সের কাছে গিলফয়েলের পাওনা ছিল। তাদের দাবি, ডিটার্সের বক্তব্য অসত্য।
আইনজীবীদের ভাষ্য, আগে সম্পন্ন করা কাজের পারিশ্রমিক চাওয়া দুর্নীতি নয়। ফলে অর্থ চাওয়ার ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার কোনো চূড়ান্ত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
দামি উপহার ও লবিস্টকে নিয়ে বিতর্ক
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিলাসবহুল উপহার গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি গ্রিসের একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা এক লবিস্টকে সরকারি বৈঠকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই প্রতিষ্ঠানকে আঞ্চলিক জ্বালানি খাতের বিভিন্ন চুক্তি পেতে সহায়তা করার চেষ্টা করেছিলেন গিলফয়েল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তবে গিলফয়েলের আইনজীবীরা তার ভ্রমণসংক্রান্ত প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছেন। তাদের দাবি, উপহার গ্রহণ ও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি সরকারি নিয়ম মেনেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।
ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ গিলফয়েল
গিলফয়েল দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে চার বছর বাগদানসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন তিনি। তাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর গিলফয়েলকে গ্রিসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ওই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গিলফয়েল ট্রাম্পের সমর্থক মহলে পরিচিত মুখ।
সোমবার হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প গিলফয়েলকে বরখাস্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার কথা জানান।
তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি বিবেচনা করছি—হ্যাঁ। আমরা সন্তুষ্ট নই।”
এর এক দিন পরই গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার ঘোষণা দেয় হোয়াইট হাউস।
গিলফয়েলের পক্ষে কথা বলেন মার্কো রুবিও
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিস সফরে ছিলেন। অভিযোগ প্রকাশের পরও তিনি সরাসরি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তবে এথেন্স সফরে একাধিক অনুষ্ঠানে গিলফয়েলের সঙ্গে অংশ নেন এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার প্রশংসা করেন।
রুবিও গিলফয়েলকে ‘এখানে একজন শক্তিশালী রাষ্ট্রদূত’ বলে অভিহিত করেন। অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো একটি সূত্রের দেওয়া তথ্য প্রকাশিত হলেই সেটি ধ্রুব সত্য হয়ে যায় না।
তিনি বলেন, “আমার কাছে সেটি ধ্রুব সত্য নয়। আমরা এভাবে কাজ করি না।”
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের পরও রুবিও সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। তবে পরবর্তী সময়ে হোয়াইট হাউসের পদত্যাগের নির্দেশে প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
তদন্তের দাবি ডেমোক্র্যাটদের
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ সদস্য গ্রেগরি মিকস গিলফয়েলকে কমিটির সামনে হাজির করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অন্য কোনো ব্যক্তি বা উৎস থেকেও গিলফয়েল অর্থ চেয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
মঙ্গলবার পদত্যাগের নির্দেশের ঘোষণা আসার পর প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা বলেন, পদত্যাগ করলেই গিলফয়েল জবাবদিহি থেকে মুক্তি পাবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে নিজের অবস্থান ব্যবহার করে গিলফয়েল সম্পদশালী হয়েছেন। তাদের মতে, কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা জানতে কংগ্রেসের তদারকি প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র দপ্তরের তদন্ত
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় (ওআইজি) তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্র।
তবে পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, নীতিগত কারণে তারা তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ে নিশ্চিত বা অস্বীকার করেন না এবং এ নিয়ে মন্তব্যও করেন না।
গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার পর তদন্তের কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আলাদা তদন্ত শুরু করে কি না, তার ওপর নির্ভর করতে পারে বলে জানিয়েছেন ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র।
বিচার বিভাগ তদন্ত শুরু না করলে পররাষ্ট্র দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে যেতে পারে। তবে তদন্তের ফল প্রকাশে প্রায় এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
পদত্যাগেই কি শেষ হচ্ছে বিতর্ক?
গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
একদিকে গিলফয়েলের আইনজীবীরা বলছেন, তিনি আগে সম্পন্ন করা কাজের পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ডিটার্সের দাবি, অর্থ দেওয়ার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি যুক্ত ছিল।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে। পাশাপাশি কংগ্রেসের তদারকি ও পররাষ্ট্র দপ্তরের তদন্তের মাধ্যমে সরকারি পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
Posted ৫:৪০ পিএম | মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।