বিনোদন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | 1 বার পঠিত

মঞ্চে ড্রিম সিকোয়েন্সের লাইট। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘বেলা চাও’। এভাবেই শুরু হয় বটতলার নাটক ‘রাইজ অ্যান্ড শাইন’। একজন পোশাক শ্রমিকের রোজকার দিনের শুরুর কিছু সময় নিয়েই নাটকটি আবর্তিত হয়। ধীরে ধীরে পোশাকশিল্পে কর্মরত নিম্নবিত্ত নারীদের জীবন-সংগ্রাম, শ্রম শোষণ এবং পারিবারিক নিপীড়নের এক নির্মম অথচ বাস্তবচিত্র আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে।
দারিও ফো এবং ফ্র্যাঙ্কা রামের মূল রচনার রূপান্তরিত এ নাটকটি কেবল একজন গার্মেন্টকর্মী নারীর গল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারীদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীকী উপস্থাপন। নাটকের শুরু থেকেই দর্শককে এক দমবন্ধ পরিবেশে নিয়ে যাওয়া হয়; যেখানে দারিদ্র্য, অনিরাপত্তা, ক্লান্তি এবং ভয় একাকার হয়ে যায়।
নাটকটির একক সংলাপনির্ভর নির্মাণ এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। পুরো নাটকে নারী চরিত্রটি একাই মঞ্চে উপস্থিত থেকেও বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। তাঁর দুঃস্বপ্ন, ঘুম ভাঙার আতঙ্ক, কারখানায় যেতে দেরি হওয়ার ভয়, শিশুকে সামলানো, স্বামীর দায়িত্বহীনতা–সবকিছু মিলিয়ে চরিত্রটি একটি শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। তাঁর সংলাপে একইসঙ্গে মিশে আছে হাস্যরস, ব্যঙ্গ, হতাশা–অনেক সময় প্রতিবাদ। তাই মঞ্চে কেবল করুণ বাস্তবতার বয়ানই প্রতিভাত হয় তা নয়; বরং এতে প্রচ্ছন্ন রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্য।
নাটকটির সংলাপ অত্যন্ত জীবন্ত ও বাস্তবধর্মী। আঞ্চলিক উচ্চারণ ও কথ্য ভাষার ব্যবহারে চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। দর্শক খুব সহজেই এই নারীর ক্লান্তি, রাগ ও বেদনা অনুভব করতে পারে।
বিশেষ করে চাবি হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাটকে যে বিশৃঙ্খল ও হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা আসলে চরিত্রটির মানসিক চাপ ও ভাঙনের প্রতীক। একদিকে সে সন্তানকে সামলাচ্ছে, অন্যদিকে গার্মেন্টসে সময়মতো পৌঁছানোর আতঙ্কে ছুটছে–এই দ্বৈত সত্তা এবং এর চাপই নাটকের কেন্দ্রীয় সংকট।
তবে আমার কাছে নাটকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক মনে হয়েছে এর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি রাষ্ট্র; যেখানে নারী নিপীড়ন, শিশু ধর্ষণ, বাল্যবিয়ের মতো ঘটনাগুলো দৈনন্দিন ব্যাপার–সে রাষ্ট্রের শ্রেণি কাঠামোয় শ্রমজীবী নারীর অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গেলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় বলতে হয়, ‘গরীবের মধ্যে সে গরীব, ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক।’
নারী চরিত্রটি বারবার প্রশ্ন তোলে কেন সংসারের সব দায়িত্ব নারীর ওপর বর্তায়, অথচ তাঁর শ্রম ও কষ্টের স্বীকৃতি নেই। স্বামীর সঙ্গে তাঁর কথোপকথনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দ্বিচারিতা, কপটতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে গার্মেন্টস মালিক, বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এবং শ্রম শোষণের সম্পর্কও নাটকে তীব্রভাবে উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে নাটকটি ব্যক্তিগত জীবনের সংকট ছাড়িয়ে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সমালোচনায় রূপ নিয়েছে।
তবে নাটকের দীর্ঘ সংলাপ কিছু ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতে পারে। বিশেষ করে একই ধরনের অভিযোগ ও হতাশার বর্ণনা নাটকের গতি কিছুটা মন্থর করেছে। নাটকটি সম্পূর্ণ সংলাপনির্ভর হওয়ায় কাজী রোকসানা রুমার মতো নন্দিত অভিনেত্রীর দক্ষ অভিনয় ছাড়া এর আবেগ ও ব্যঙ্গের গভীরতা দর্শকের কাছে পুরোপুরি পৌঁছানো বলতে গেলে বেশ কঠিনই ছিল।
নাটকটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন আবদুস সেলিম। নির্দেশনায় ম. সাঈদ।
জীবনযুদ্ধ আর সংসারের ঘানিতে আটকে পড়া এক নারীর গল্প ‘রাইজ অ্যান্ড শাইন’। আদতে আমাদের সব নারীর গল্পই এটি নয় কি?
Posted ২:৫৭ এএম | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।