জাতীয় ডেস্ক | বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 69 বার পঠিত

জব্বার আলী মিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে হাবিলদার ছিলেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বীরত্বের সঙ্গে। কয়েক বছর পর অবসর হয়েছে। এখন খুলনা শহরে থাকেন। ১৯৭১ সালের মে মাস। তাঁর ভাতিজা হাসমত আলী দেশের ভিতর থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করছে। তার নাম এখন হাসমত কম্যান্ডার। ঝাউডাঙ্গা বাসস্ট্যাণ্ড থেকে কিছু ভিতরে তার ক্যাম্প। বিকাল বেলা বটতলায় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। কম্যাণ্ডার হাসমত আলী তার দলের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জ্যাঠাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর সবাই গান ধরল “ধনধান্য পুষ্পভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা”─এই গান জব্বার মিয়া কখনও শোনেন নাই। গানের সুর তার মন স্পর্শ করল। তিনি কান উঁচিয়ে গানের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করলেন। তার চোখে অজানা কারণে পানি এসে গেল।
জব্বার আলী মিয়াকে বক্তৃতা দেয়ার জন্য দাঁড়াতে হলো। তিনি বললেন, ‘বাবারা, এরকম যুদ্ধ আমি জীবনে দেখি নাই। এরকম যুদ্ধের কথা কোনো দিন শুনি নাই। এরকম যুদ্ধকে কী বলে তা-ও আমি জানিনা। যে দেশের সেনাবাহিনী নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে সেটা কীরকম সেনাবাহিনী তা আমার বুঝে আসে না। যাই হোক, আমি আপনাদের দোয়া করতে এসেছি।’
জব্বার আলী মিয়া স্কুলের শিক্ষক ছিলেন না। তবু যুদ্ধের কলাকৌশল নিয়ে নানা কথা বলতে বলতে তার বক্তৃতা দীর্ঘ হয়ে গেল। তিনি প্রশংসা করে বললেন, ‘বাবারা, আপনারা আসছেন দেশকে বাঁচানোর জন্য। আপনারা দেশকে হানাদার বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করতেছেন। আপনাদের দেশপ্রেমের তুলনা হয়না। দেশপ্রেম একজন যোদ্ধার বড় শক্তি।’
দীর্ঘ বক্তৃতার শেষভাগে জব্বার আলী মিয়া দার্শনিক হয়ে পড়লেন। তিনি উদাস কণ্ঠে বললেন, “পৃথিবীতে ‘বাংলা দেশ’ নামে কোন দেশ নাই। বাঙ্গালীদের জন্য কোন আলাদা রাষ্ট্র নাই। আপনারা যুদ্ধ করতে আসছেন পৃথিবীতে বাঙ্গালীদের জন্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে। আমরা যখন সেনাবাহিনীতে ছিলাম, তখন সীমান্ত রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করেছি। আপনাদের যুদ্ধ নতুন সীমান্ত তৈরি করার যুদ্ধ।”
এই ঘটনা কোন বাস্তব কাহিনী নয়। এ ঘটনা একটি উপন্যাসের অংশবিশেষ। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস। ঔপন্যাসিকের কাজ গল্প বলা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস মাত্রই ইতিহাসকেন্দ্রিক আখ্যান। ইতিহাস প্রণয়ন কথাসাহিত্যিকের কাজ নয়। কিন্তু ইতিহাসকেন্দ্রিক কাহিনীতে লেখককে ইতিহাসের বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে অবহিত থাকতে হয়; কেবল তাই নয় ইতিহাসের মর্ম অনুধাবনে সক্ষম হতে হয়। ইতিহাসের সঠিক চেতনার অভাবে উপন্যাস পাঠককে বিভ্রান্ত করে ফেলে।
কাহিনীর নায়ক হাসমত কম্যাণ্ডারের জ্যাঠা জব্বার আলী মিয়ার বয়ানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য স্পষ্ট: ‘‘আমরা যখন সেনাবাহিনীতে ছিলাম, তখন সীমান্ত রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করেছি। আপনাদের যুদ্ধ নতুন সীমান্ত তৈরি করার যুদ্ধ।’’ জব্বার আলী মিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বলছেন: ‘‘আপনারা যুদ্ধ করতে আসছেন পৃথিবীতে বাঙ্গালীদের জন্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে।’’ –এই কথা সামান্য নয়।
উপন্যাসটির পার্শ্ব চরিত্র জব্বার আলী মিয়ার বয়ান উনিশশ’ একাত্তর সালের ফেব্রুয়ারীতে শেখ মুজিব কর্তৃক প্রদত্ত সাক্ষাৎকারের ভাষ্যের সমান্তরাল নয়। এই ভিডিও সাক্ষাৎকারটি অন্তর্জালে সুলভ। প্রেসিডেণ্ট ইয়াহিয়া খান জানুয়ারি মাসে সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্ভাষণ জানিয়েছেন। কিন্তু সেনাশাসকেরা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করছিল। দেশে শোরগোল, বিক্ষোভ। এ সময় বিদেশী সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি কি (পূর্ব পাকিস্তানের) স্বাধীনতা চাইছেন?’’ উত্তরে মুজিব বলেছিলেন, “স্বাধীনতা নয়। আরো বিকল্প আছে। আমরা মুক্তি চাই। আমরা (পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ) আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চাই।” শেখ মুজিবের কাছে মুক্তি (ইমানসিপেশন) আর স্বাধীনতা (ইন্ডেপেন্ডেন্স) সমার্থক ছিল না। স্বাধীনতা মানে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যুদয়।
২.
১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ কেন সংঘটিত হয়েছিল এ প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক নয় আজ; কেননা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব এই মুহূর্তে কোন হুমকির সম্মুখীন নয়। ১৯৭১-এর অবস্থা ছিল ভিন্ন। পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রটির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ১৯৭১-এর যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে তখন আগস্ট মাসের চোদ্দ তারিখ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী একটি রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছিল। রচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘কেন পাকিস্তান’। নবম-দশম শ্রেণীর স্কুলছাত্রদের জন্য বিষয়বস্তুটি সহজ ছিল এরকম ভাববার কোন কারণ নেই। ‘কেন পাকিস্তান’-এর মত ‘কেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ’ এই প্রশ্নটি আজকাল উচ্চারিত হতে শোনা যাচ্ছে। দেশে এরকম রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়; যা ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চায়। এই প্রচেষ্টা নেহায়েৎ বিভ্রান্তিকর।
আজ এমতরূপ তর্ক নিষ্প্রয়োজন যে টেবিল খাঁটি বাংলা, তৎসম, তদ্ভব অথবা বিদেশী শব্দ কি-না। ব্যাকরণের বইতে শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে আলোচনা থাকবে। বড় আকারের অভিধানে প্রতিটি শব্দের ব্যুৎপত্তি উল্লেখ থাকতে পারে। ২০২৫ সালে লাঙ্গল, গঞ্জ, চোঙ্গা, টেবিল, কারখানা, আলপিন, হরতাল, চাকু, মহাফেজখানা, সম্মান, চাঁদ, আঁখি সবই বাংলা শব্দ। আমরা পরিষদ লিখব না পর্ষদ লিখব, এসব তর্কও নিরর্থক ও কালক্ষেপণ মাত্র।
যাইহোক ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদয়ের একটি আন্তর্জাতিক এবং একাধিক স্থানীয় প্রেক্ষাপট ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের শুরুর দিকে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করেছিল। এজন্যে ১৮৫৮ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট ‘গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া আইন’ পাস করা হয়েছিল। তদাবধি ভারতবর্ষের ভাগ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কব্জাগত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫-এ। এর অনতিকাল পরে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে যায়। তারা কেন ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিল তার প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে জানা নেই। তখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ক্লেমেণ্ট অ্যাটলি। সাতচল্লিশের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিয়ে বলেছিলেন ১৯৪৮-এর জুন মাসের মধ্যে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হবে। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন পাস করা হয়েছিল। এই আইনে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাবসানের কিছু কার্যকারণ উল্লেখ করা হয়েছে।
লর্ড মাউন্টব্যাটেন তখন ভারতে ব্রিটেনের ভাইসরয়। বিষয়টি এখনও কৌতূহলোদ্দীপক যে তিনি ভারতবর্ষে অতি দ্রুত ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য তৎপর হয়েছিলেন। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে মাউন্টব্যাটেন মূল সমস্যাটি অনুধাবন করেছিলেন। মূল সমস্যা ছিল ভারতের কংগ্রেস পার্টি এবং মুসলিম লীগের মধ্যে নীতি ও আদর্শগত পার্থক্য। লর্ড মাউন্টব্যাটেন কেন তাড়াহুড়া করছিলেন তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু অচিরেই তার সক্রিয় উদ্যোগে পূর্বে ঘোষিত ১৯৪৮-এর জুন মাসের পরিবর্তে ১৯৪৭-এর আগস্ট মাসে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়ে গেল। ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো কিন্তু দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হলো: একটি পাকিস্তান, অন্যটি ভারত। স্বাধীন দুটি রাষ্ট্র। মাউন্ট ব্যাটেনের ধারণা হয়েছিল, ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিতে হলে একে ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করতে হবে। তার কাছে মনে হয়েছিল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ সেটাই চাচ্ছিলেন।
কেবল ভারতবর্ষ ভাগ হলো তাই নয়; পাঞ্জাব ভাগ হলো, বাংলা ভাগ হলো। ১৯০৫ সালেও ব্রিটিশরা বাংলাকে ভাগ করেছিল। ঢাকা হয়েছিল পূর্ববঙ্গের রাজধানী। কিন্তু কোলকাতাকেন্দ্রিক তৎকালীন রাজনীতির হিন্দু ধর্মাবলম্বী কর্ণধারদের তা পছন্দ হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। তিরিশ বছরের মধ্যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ পরিণত হয়েছিল ভারতবর্ষের একটি জনপ্রিয় এবং শক্তিধর রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে। মুসলিম লীগ মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা করতে চেয়েছিল।
সে কারণেই মুসলীম লীগের উদ্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হলো মুসলমানদের দেশ হিসেবে। পুনর্বার ভাগ হলো বাংলা। কংগ্রেসের নেতারা পরম সন্তুষ্টি বোধ করলেন।
৩.
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে বসে বলা অন্যায্য হবে না যে, বাংলাদেশ পুরোনো একটি দেশ যার বয়স পঞ্চান্ন। বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক পরিচয় হলো তারা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক। তারা অন্য দেশের প্রজা নয়। বাংলাদেশ কোনো প্রদেশ নয়। পঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশের বাঙ্গালীরা একটি নিজস্বতা অর্জন করেছে যা ভিন্ন দেশের বাঙ্গালীদের থেকে ভিন্ন। উনিশশ’ একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ অকিঞ্চিৎকর শক্তি নিয়ে সশস্ত্র পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল পরাধীনতার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। দূরদর্শী জননেতা মওলানা ভাসানী বহু আগেই পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের ‘ওয়ালাইকুম আস-সালাম’ বলে দিয়েছিলেন।
১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের ভয়াবহ ভোলা সাইক্লোনের প্রেক্ষাপটে ২৩শে নভেম্বর ভাসানী সাহেব পুনরায় পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘স্বাধিকার নয়, স্বায়ত্তশাসন নয়, আমরা চাই স্বাধীনতা’। ১৯৭১-এর জানুয়ারি মাসে মওলানা ভাসানী আমাদের বাসা থেকে মিছিল নিয়ে সার্কিট হাউজে যাচ্ছিলেন জনসভার উদ্দেশ্যে। তার শ্লোগান ছিল: ‘স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ, আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ।’ আমি সেই মিছিলে ছিলাম ভাসানী সাহেবের মলিন পাঞ্জাবির খুব কাছে। আমিও বলেছিলাম–কিছু না বুঝেই–‘স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ, আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ।’ স্বাধীন বাংলার দাবী কোনো আগন্তুক দাবী ছিল না। ২৫ শে মার্চের মধ্য রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করলে অষ্টম ব্যাটালিয়নের সেকেণ্ড ইন কম্যাণ্ড জিয়া কোন্ সাহসে নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান দাবী করেছিলেন তা ইতিহাসের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা নিয়ে তার মনে দ্বিধা ছিল মনে হয় না।
Posted ১০:৩৭ এএম | বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।