রাজনীতি ডেস্ক | মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 3 বার পঠিত

বিএনপিকে জনগণ এবার লাল কার্ড দেখাবে– মন্তব্য করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে জনগণ একটি নতুন বাংলাদেশ পাবে।
গতকাল সোমবার দুপুরে কক্সবাজার শহরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় এ কথা বলেন তিনি। জামায়াত আমির এর আগে সকালে মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
কক্সবাজার শহরের জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, রাজার ছেলে রাজা হোক– এই মতবাদে আমরা বিশ্বাসী নই। এ দেশে এমপি, মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী– যে-ই হোক, অপরাধ করলে তার বিচার নিশ্চিত করতে চাই। তিনি বলেন, ১২ তারিখ আমরা নিজেরা হ্যাঁ ভোট দেব এবং দেশের জনগণকে হ্যাঁ ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করব। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে কক্সবাজার আলোকিত হবে।
জাতিকে বিভক্ত নয়; ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, কক্সবাজার একটি সম্ভাবনাময় এলাকা। এখানকার প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম উন্নয়ন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সে জন্য ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমরা কথা দিয়ে কথা রাখি। আমরা বেঁচে থাকলে কোনো ওয়াদার বরখেলাফ হবে না।
জামায়াত আমির বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের নয়, এটি জাতির দিক পরিবর্তনের নির্বাচন। এটি জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা পূরণের নির্বাচন এবং মা-বোনদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন। ১২ তারিখ দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে দেশের জনগণ তা প্রমাণ করে দেবে।
মহেশখালীর জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না; আমরা চাই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে সেটিই হবে প্রকৃত বিজয়– আমিও সেই বিজয়ের অংশ হবো। তিনি ঘোষণা দেন, ১১-দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের হামিদুর রহমানকে জয়ী করলে তাঁকে মন্ত্রী করা হবে।
কক্সবাজার শহরের জনসভায় জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় ও জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারীর সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক, কক্সবাজার-৩ আসনের শহিদুল আলম বাহাদুর, কক্সবাজার-৪ আসনের নুর আহমদ আনোয়ারী, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মাহমুদা মিতু, জাগপার কেন্দ্রীয় সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মো. সিগবাতুল্লাহ সিফাত প্রমুখ।
‘লুটেরাদের পেটে হাত ঢুকিয়ে সব বের করে আনা হবে’
জামায়াতে ইসলামী জোট ক্ষমতায় গেলে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শফিকুর রহমান। দুপুরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পদুয়ায় নির্বাচনী সভায় তিনি বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি, আল্লাহতায়ালা ইনসাফের সরকার গঠনের সুযোগ দিলে ওইসব লুটেরার পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সব বের করে আনা হবে। সে অর্থ রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা হবে। ইনসাফের ভিত্তিতে তখন সারা বাংলাদেশের উন্নয়নে ব্যয় হবে।
জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে জনপ্রতিনিধি ও তার পরিবারের আয়-ব্যয় প্রতিবছর জনগণের কাছে প্রকাশ করার কথা বলেছেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, যত ধরনের অপরাধ-দুর্নীতি আছে, আমরা কোনো অপরাধ-দুর্নীতির লেজ ধরে টানাটানি করব না। আমরা কান ধরে টান দেব, ইনশাআল্লাহ। কান থাকে মাথার দুই পাশে, মাথা ঠিক হলে সব ঠিক। মাথা হচ্ছে জাতির নেতৃত্ব। মাথা যখন পচে যায়, তখন শরীর আর কাজ করে না। আমাদের ৫৪ বছরের নেতৃত্ব নিজেদের সুস্থ মাথার প্রমাণ দিতে পারেনি। এ জন্যই জনগণের টাকা লুণ্ঠন করে এরা বড়লোক হয়েছে; কিন্তু জনগণের যা পাওনা ছিল জনগণ তা পায়নি।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামীর আয়োজনে এ নির্বাচনী সমাবেশে শফিকুর রহমান দক্ষিণ চট্টগ্রামের দলীয় এবং জোটের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ।
‘ভোট কেড়ে নিতে এলে হাত গুঁড়িয়ে দেব’
বিকেলে সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন ডেপারপাড় মাঠে অনুষ্ঠিত ১১-দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, ফ্যাসিবাদের স্লোগান ছিল– আমার ভোট আমি দেব, তোমার ভোটও আমি দেব। সেই দিন শেষ। আমার ভোট আমি দেব, তোমারটা তুমি দাও। কিন্তু আমার ভোট কেড়ে নিতে এলে হাত গুঁড়িয়ে দেব।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, টাকা দিয়ে ভোট নিতে এলে তাদের ছেড়ে দেবেন না, তবে আইনও হাতে নেবেন না বলে উল্লেখ করেন। যারা চাঁদাবাজ-ধান্ধাবাজ, যারা মামলাবাজ-দুর্নীতিবাজ, তাদের বলব এগুলো ছেড়ে দেন। এগুলো খারাপ কাজ। আর কখনও এই দেশকে কোনো ঋণখেলাপীর হাতে তুলে দেব না।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘মায়েরা আমাদের মাথার তাজ। আমরা তাদের সর্বোচ্চ আসনে রেখে কিছুটা ঋণ শোধ করতে চাই। পুরো ঋণ কখনও শোধ করা সম্ভব নয়। মায়েদের নিয়ে কেউ কেউ উল্টাপাল্টা করছে আমরা জানি। আমি এর প্রতিবাদ করি। গত পরশুদিনও আমার পেছনে লেগেছে। যারা আমার পেছনে লেগেছে, এটা এক দিন তাদের গলার ফাঁস হয়ে ঝুলবে।’
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জমায়াতের আমির আলাউদ্দিন শিকদারের সভাপতিত্বে জনসভা হয়। এতে আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী সাইফুল রহমান, চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-৪ আসনের আনোয়ার সিদ্দিক, চট্টগ্রাম-৫ আসনের নাছির উদ্দিন মনির, চট্টগ্রাম-৬ আসনের শাহজাহান মুঞ্জু প্রমুখ।
‘মানুষ কোনো কার্ডের ধার ধারে না’
রাতে চট্টগ্রামের বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। সেখানে তিনি বলেন, আগে মায়ের মর্যাদা, তারপর ফ্যামিলি কার্ড। মানুষ কোনো কার্ডের ধার ধারে না। মায়েদের গায়ে হাত দিলে আগুন জ্বলে উঠবে। ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না।
‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ঠ্যালার নাম বাবাজি। এখন তারা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে বলতে শুরু করেছেন। তবে তাদের মুখের কথা যেন মনের কথা হয়।
এক্স আইডি হ্যাক করা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, আমার আইডি হ্যাক করে এমন জঘন্য বিষয় করা হয়েছে, যা মুখে বলা যায় না। এমন নোংরা কথা জীবনে বলিনি, শুনিওনি। ইতোমধ্যে আবিষ্কার হয়েছে, কারা এটা করেছে। তাদের পেছনে কারা, সেটাও আবিষ্কার করা হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে জনসভায় চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোটের প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফের হাতে শাপলা কলি প্রতীক, চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম-১০ আসনের অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী, চট্টগ্রাম-১১ আসনে শফিউল আলম এবং খাগড়াছড়ি আসনে এয়াকুব আলী চৌধুরীর হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন জামায়াত আমির।
‘গেম অব থ্রোনস’-এর আদলে জামায়াত আমিরের পোস্টার
জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘গেম অব থ্রোনস’-এর বহুল পরিচিত একটি সংলাপ– ‘উইন্টার ইজ কামিং’। ২০১১ সালে সিরিজের শুরুতেই শেষ সময়ের সতর্কবার্তা ও বিপদের প্রতীক ইঙ্গিত করে দেওয়া হয় এই সংলাপ। এবার এই স্লোগান দেখা গেল চট্টগ্রামের সড়কে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় সাঁটানো হয়েছে এই সংলাপ লেখা ব্যানার। তবে সিরিজের মূল চরিত্রের স্থানে দেওয়া হয়েছে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের ছবি।
গতকাল নগরের হালিশহর ও চকবাজার এলাকায় এই ব্যানার দেখা গেছে। ব্যানারে ‘গেম অব থ্রোনস’-এর মূল চরিত্র জন স্নোর স্থলে জামায়াতের আমিরের ছবি দেওয়া হয়েছে। ছবিতে জন স্নোর তলোয়ারের আদলে দাঁড়িপাল্লা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। পুরো ব্যানারের পটভূমিতে তুষার ও নেকড়ের ছবি রয়েছে। একেবারে নিচে লেখা, দাদু ফ্যান ক্লাব সিটিজি।
চট্টগ্রাম নগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, ‘এ ধরনের ব্যানারের কথা আমরা শুনিনি। আমাদের প্রচারণার ব্যানারগুলো সংগঠনের নামেই টাঙানো হয়েছে।’
(সংশ্লিষ্ট ব্যুরো ও প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য)
Posted ৭:৫১ এএম | মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।