বিশ্ব ডেস্ক | রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | 1 বার পঠিত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে এক নাটকীয় রাজনৈতিক পট পরিবর্তন দেখা গেছে। গত ১৫ বছর ধরে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এই নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি তৃণমূলের এই আঞ্চলিক দুর্গ ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে।
ফরেন পলিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচনে প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি ২০৭টি আসন জিতেছে। অন্যদিকে ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃণমূল পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন। এই পরাজয়ের ফলে বিদায় নিতে হয়েছে দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এখন প্রশ্ন হলো, নিজস্ব আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য পরিচিত এই রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির এমন জয়ের পেছনে কী কারণ কাজ করেছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই সাফল্যের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেড় দশক ক্ষমতায় থাকায় তৃণমূলকে তীব্র সরকারবিরোধী জনমতের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার সময় তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য বড় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থ হওয়ায় এ জনরোষ তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশি অভিবাসন আতঙ্ক ও হিন্দু ভোটের মেরূকরণ
বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ছিল। বিজেপি চতুরতার সঙ্গে একে কাজে লাগিয়েছে। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর সেখানে হিন্দুদের ওপর কিছু হামলার ঘটনা ঘটে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এই ইস্যু জোরালোভাবে তুলে ধরে। এতে হিন্দুদের মনে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয় এবং হিন্দু ভোট বিজেপির পক্ষে চলে যায়।
এ ছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম ভোটারদের ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও বিজেপি সামনে আনে। তারা তৃণমূলকে মুসলিমপন্থির চেয়ে হিন্দুবিরোধী দল হিসেবে বেশি প্রচার করে। ফলে বিপুলসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
এই নির্বাচনে বিজেপির কৌশলের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি ছিল ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া। এটির উদ্দেশ্য ছিল ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখাতে না পারায় পশ্চিমবঙ্গের ৯০ লাখের বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বাদ পড়া ভোটারদের সিংহভাগই ছিলেন এমন সব নির্বাচনী এলাকার, যেখানে বিজেপি অতীতে কখনও জিততে পারেনি।
রাজ্যটিতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম এবং তাদের একটি বড় অংশই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। ভারতের অনেক দরিদ্র মানুষের জন্মসনদ নেই এবং পাসপোর্টের মতো অন্য কোনো বিকল্প পরিচয়পত্রও নেই। ফলে তারা খুব সহজেই এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার শিকারে পরিণত হয়।
তৃণমূলের চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট চক্র
মমতার দীর্ঘ শাসনামলের অভ্যন্তরীণ ত্রুটিও ভোটারদের কাছে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল। প্রথমত, তৃণমূলের বিশাল কর্মী বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট চালানোর অভিযোগ ছিল। এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সাধারণ ভোটারদের দল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, মমতার মূল ভিত্তি নারী ভোটাররা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন। ২০২৪ সালে কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শহরের নারীরা ফেটে পড়েন। এরপর দুর্গাপুরের আরেকটি ঘটনার পর মমতার একটি মন্তব্য বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি ছাত্রীদের রাতে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে গ্রামীণ নারীরাও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্থানীয় নেতাদের জুলুমের কারণে মমতার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন।
ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এক আশঙ্কাজনক বার্তা
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে সরাতে বিজেপি যেসব কৌশল নিয়েছে, তা ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যান্য রাজ্যেও দলটির এমন আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবিরাম নেতিবাচক প্রচারণা এবং ভোটের আগে ভোটার তালিকা তৈরিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব ঘটনা ভবিষ্যতে ভারতের রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ইঙ্গিত হতে পারে।
সীমান্তে কাঁটাতার ও ধর্মীয় কড়াকড়ি, শুভেন্দুর সরকার কি বিতর্কের মুখে
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম সরকার গঠনের পর দায়িত্ব নিয়েই একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সীমান্তে কাঁটাতার, ধর্মীয় কড়াকড়ি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাজ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। এসব পদক্ষেপ একদিকে সরকারি ব্যবস্থার জড়তা ভাঙার চেষ্টা, অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের আগ্রাসী রূপরেখা, যা রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণ তৈরি করেছে।
কলকাতার তিলজলার একটি চামড়া কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিকের মৃত্যুর পর মুখ্যমন্ত্রী ভবনটিকে অবৈধ ঘোষণা করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেন। এর পরদিনই আরজি কর কাণ্ড সঠিকভাবে না সামলানোর অপরাধে কলকাতার সাবেক পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলসহ তিন শীর্ষ আইপিএস কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। বিজেপি এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও বাম ও আইএসএফ নেতৃত্ব একে পেশিশক্তির রাজনীতি আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে।
সীমান্তে কাঁটাতার স্থাপন ও সরকারি প্রকল্প
শুভেন্দু সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মেনে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ দ্রুত শেষ করতে ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের হাতে জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ পড়েছে, তারা কোনো সরকারি বা কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।
তবে শিক্ষিত যুবকদের ক্ষোভ প্রশমনে সরকারি চাকরিতে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা।
Posted ৪:০৮ এএম | রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।