ডেস্ক রিপোর্ট | রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | 11 বার পঠিত

ফাইল ছবি
গাজায় যুদ্ধ ও ব্যাপক প্রাণহানির মধ্যে এবার মৃতদের দাফনের জায়গারও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একের পর এক কবরস্থান পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে পুরোনো কবর পুনরায় ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোথাও কবরের চিহ্ন হিসেবে রাখা হচ্ছে শুধু একটি পাথর ও কাগজে লেখা মৃতের নাম। আবার কোথাও ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি কিংবা ঢেউটিন দিয়ে তৈরি হচ্ছে অস্থায়ী কবরের চিহ্ন।
এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। ইসরায়েল-নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা সামরিক এলাকার কাছে গুলিতে নিহত বাবা মোহাম্মদ আল-সাওহিকে দাফনের জন্য কবরের জায়গা খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখেন, কবরস্থানগুলোতে নতুন মরদেহ দাফনের মতো জায়গা প্রায় নেই।
জেইতুন এলাকার ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ একটি সড়কের পাশে ছোট দোকানে চা-কফি বিক্রি করতেন। গত ১০ জুন কাজ করার সময় গুলিতে ঘাড়ে আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।
বাবার মরদেহ নিয়ে ওমর জেইতুন কবরস্থানে গেলে দেখেন, যুদ্ধের সময় নিহত অসংখ্য মানুষের কবর পাশাপাশি ঠাসাঠাসি করে রয়েছে। অনেক কবর এতটাই অস্থায়ী যে, সেগুলো চিহ্নিত করতে একটি পাথরের সঙ্গে মৃতের নাম লেখা কাগজ লাগিয়ে রাখা হয়েছে।
ওমর বলেন, ‘আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অসংখ্য কবর দেখেছি। চারদিকে শুধু বালুর স্তূপ, যার নিচে মানুষকে দাফন করা হয়েছে।’
পুরোনো কবরেই বাবাকে দাফন
গাজায় একটি কবর তৈরিতে বর্তমানে প্রায় ৫০০ শেকেল বা ১৬৭ ডলার খরচ হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করাও কঠিন। তার ওপর রয়েছে কবরস্থানে জায়গার সংকট।
ওমর জানান, নতুন কবরের জন্য জায়গা না থাকায় শেষ পর্যন্ত তার দাদার কবরেই বাবাকে দাফন করতে হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে মৃতদের শনাক্ত ও দাফনের ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়েছে। ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকি এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা অচল হয়ে পড়ায় হাজার হাজার নিহত ফিলিস্তিনিকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
অনেক মরদেহ দাফন করা হয়েছে বাড়ির আঙিনা, তাঁবুর পাশে, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবির, স্কুল ও হাসপাতালের চত্বরে। যুদ্ধের তীব্রতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকভাবে দাফনের সুযোগও মেলেনি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর হামলার মাত্রা কিছুটা কমলে বহু পরিবার ধ্বংসস্তূপ ও অস্থায়ী কবর থেকে স্বজনদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে।
গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালগুলোর চত্বরে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ধ্বংস হয়েছে ৪০টির বেশি কবরস্থান
গাজার ধর্মীয় বিষয়ক ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কবরস্থানে প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় মৃতদের দাফনের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।
যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। আগে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত অনেক জায়গা এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
কবর তৈরির প্রয়োজনীয় সামগ্রীরও তীব্র সংকট রয়েছে। গাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, পাথরসহ নির্মাণসামগ্রীর সংকটে বর্তমানে একটি মরদেহ দাফনে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল বা ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
অর্থের অভাবে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদামাটি কিংবা ঢেউটিন ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করছে।
এক কবরস্থানে ৬০ থেকে ৬ হাজার কবর
গাজায় দীর্ঘদিন ধরে কবর খননের কাজ করছেন ৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব। ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে এই পেশায় থাকা তাফেশের কাছে বর্তমান যুদ্ধই তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।
তিনি খান ইউনিস কবরস্থানে কাজ করেন। যুদ্ধ শুরুর সময় সেখানে ছিল প্রায় ৬০টি কবর। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজারে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তাকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি কবর খনন করতে হয়েছে।
তাফেশ বলেন, ‘এত ভয়াবহ রক্তপাত আমরা আগে কখনও দেখিনি। এমন কোনো দিন যায় না, যেদিন কয়েক ডজন শহীদকে দাফন করতে হয় না।’
তার খনন করা কবরগুলোর অনেকগুলোতেই দাফন করা হয়েছে নারী ও শিশুদের। কখনও ইসরায়েলি হামলায় একটি পুরো ভবন, গাড়ি কিংবা তাঁবু ধ্বংস হলে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মরদেহ একসঙ্গে কবরস্থানে এসেছে।
গাজায় যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এখন শুধু জীবিতদের দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিপুল প্রাণহানি, কবরস্থান ধ্বংস, জায়গার সংকট এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে মৃতদের শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করাও সেখানে আরেক ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
Posted ৭:৫৭ এএম | রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।