ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে
শিরোনাম >>

নিউইয়র্কে বিপার একটি মানবিক সন্ধ্যা

  |   সোমবার, ২০ মার্চ ২০২৩   |   প্রিন্ট   |   132 বার পঠিত

নিউইয়র্কে বিপার একটি মানবিক সন্ধ্যা

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস বিপা নিউইয়র্কের বাঙালিদের গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অজানা বিষয়গুলোর ওপর ফোকাস করছে  যে বিষয়গুলো মানবিক হওয়া সত্তে¡ও অনেক রক্ষণশীল মানুষের কাছে অত্যন্ত সেনসিটিভ। বিপার গত সপ্তাহের এই আয়োজনের নাম ছিল সমপ্রেমীদের সাতকাহন। দুই বাঙালি তরুণ তরুণী রাজু আহমেদ ও জয়মালা হাজরা তাদের নিজের জীবনের একান্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন এই সাতকাহনে। এই পর্বে এটা ছিল তাদের তৃতীয় অনুষ্ঠান।

গত ১১ মার্চ শনিবার সন্ধ্যায় জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস এন্ড লার্নিংএ আফজাল হোসেনের গাওয়া মানুষ মানুষের জন্য গান এবং বিপার তিন শিল্পীর নৃত্য দিয়ে শুরু হয় সাজানো অনুষ্ঠানটি। এই দুই তরুণের সাথে সহমর্মিতা প্রদর্শনের জন্য সকলকে সচেতন করে তোলাই অনুষ্ঠানের মূল কথা বলে জানানো হয়।

নিলুফার জেরিনের চমৎকার উপস্থাপনার পর জয়মালা হাজরা রাজু আহমেদের নানা কাজ নিয়ে প্রশ্ন করেন। রাজু আহমেদ নিজে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার। তিনি ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির এথিক্যাল পারসপেকটিভ নিয়ে কাজ করেন। এটা কৈশোরে তার হবি থাকলেও পরে বিভিন্ন ওয়ার্কশপে যোগ দিয়ে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও সৌন্দর্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। যেমন ব্র্যাক আয়োজিত কেয়ারিং মেন, জেন্ডার থ্রু দ্য লেন্স। পরে তিনি বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে ফটোগ্রাফি করেন। গত এক যুগ বাংলাদেশের এলজিবিটি কম্যুনিটি নিয়ে তোলা তার আলোকচিত্র নিয়ে প্রদর্শনী হয়। এসব আলোকচিত্রে তিনি বাংলাদেশে এই নিগৃহিত মানুষদের আনন্দ-বেদনার স্বরূপ তুলে ধরেন।

জয়মালা হাজরার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে রাজু আহমেদ কেন তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে এসেছেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে সেখানে সমপ্রেমীদের নানাভাবে নিষ্পেষিত হওয়ার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে রূপবান পত্রিকার জুলহাসের মৃত্যু সমপ্রেমীদের গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেয়। এই তরুণতরুণীরা তাদের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ঢাকার রাস্তায় মিছিল বের করে, তাদের ওপর নানা নিগ্রহ শুরু হয়।

পুলিশ ও প্রশাসনও তাদের ভবিষ্যতে কোনো মিছিল না করার পরামর্শ দিয়ে জানায়, তারা মিছিল করলে কোনো প্রটেকশন দেয়া হবে না  তিনি জানান, অনেকে গে জানার পর প্রথম প্রথম প্রশ্ন করা হয়, তুমি ছেলে না মেয়ে। আমি বলি, আমি যা আমি তাই। আমি বলি, আমি বেডরুমে কি করলাম সেটা আমার ব্যাপার। এখানে কারো মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। রাজু বলেন, আমাদের সমাজে নানা কারণে বুলিইংকে ইগনোর করা হয়।

রাজু আহমেদ বলেন, আমাকে বাংলাদেশে প্রতি পদে বুলিইংএর শিকার হতে হয়েছে।মানসিক পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে আত্মহত্যা করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কিভাবে কখন এই গে হওয়ার বোধ তৈরি হলো, জয়মালা হাজরার এমন প্রশ্নের জবাবে রাজু আহমেদ বলেন আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন অন্য ছেলেকে ভাল লাগতো। মেয়েদের প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করতাম না। তারপর থেকেই প্রথমে বাধা আসা শুরু হয় পরিবার থেকে। এই বাধা প্রচন্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। তারপর থেকে এটা নিয়ে একটিভিজম শুরু করি।

কিন্তু বাংলাদেশের একশ্রেণীর কট্টর রক্ষণশীল সমাজ কোনোভাবেই এটাকে মেনে নিতে চায় না। তারা ঘৃণা করে। এই ঘৃণাকে রোধ করার জন্য রাস্তায় নেমেছি, পত্রিকা প্রকাশ করেছি। কোনো কাজ হয়নি। এখন আমার চাওয়া, ঘৃণার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা। আমি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাবো।

জয়মালা হাজরার জন্ম নিউইয়র্ক সিটিতে। তার বাবা মা ইমিগ্রান্ট হয়ে এসেছিলেন এদেশে। তিনি এফআইটি বা ফ্যাশন ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি থেকে প্রশিক্ষণ নেন আর্টিস্ট ও ডিজাইনার হিসাবে। গত দুই দশক তিনি বিশাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাজ করেন। এর বাইরে তিনি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেন সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের ওপর। তিনি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে শুধু জেন্ডার, লেবার ও কালচারাল সাম্যর জন্য লড়াই করছেন না, তিনি তার নিজস্ব ধারণা জিরো ওয়েস্ট, আপসাইকেল্ড ফ্যাশন নিয়েও কাজ করছেন। জয়মালা হাজরা একজন কুইয়ার এলাইশিপ এডুকেটর।

রাজু আহমেদ ও জয়মালা হাজরা নিউইয়র্কের মত সিটিতে নিজের জীবনের এবং বাংলাদেশের জেন্ডার সাম্যর বিভিন্ন বিষয়ে অকপটে অনেক অজানা কথা তুলে ধরেন দৃপ্ত ভঙ্গিতে। তারা বলেন, আমরা কারো দয়া চাই না। কে আমাদের সমর্থন করলো, কে আমাদের পাশে দাঁড়ালো, কে আমাদের বন্ধু হলো কিংবা হলো না তা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। কারণ পৃথিবীর অনেক বড় বড় লেখক, দার্শনিক. বিজ্ঞানী, মুভিমেকার, শিল্পী এলজিবিটিকিউ ধারার মানুষ। আমরাও মানুষ। এবং মানুষ হিসাবে বাঁচার ও সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকার আমাদের আছে।

দীর্ঘক্ষণ তাঁদের কথা হলভর্তি উপস্থিত সুধী শোনেন। বিরতির পর আলোচনায় অংশ নেন কম্যুনিটি একটিভিস্ট এবং বাংলাদেশে শিক্ষা ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান অপটিমিস্টস’র চেয়ারম্যান মিনহাজ আহমেদ এবং বিপার অন্যতম ডিরেক্টর এবং প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী সেলিমা আশরাফ। সেলিশা আশরাফ বলেন, হেইট শব্দটি উচ্চারণ করলে বা শুনলেই মন কলুষিত হয়ে যায়। এই শব্দটির উচ্চারণ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং আমিই সেরা, এই অহংবোধ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। মিনহাজ আহমেদ বলেন, এলজিবিটিকিউদের অধিকারও মানবাধিকার। নারী ও শিশুদের যদি অধিকার থাকে, তাহলে এদেরও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। কারণ তারাও মানুষ।

মিনহাজ আহমেদ যেহেতু নিউইয়র্ক সিটির ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনে কাজ করেন, তাই তার অভিজ্ঞতা থেকে এই সিটির স্কুলে কোন্্ কোন্্ ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয় তার কয়েকটি উদাহরণ দেন।

সবশেষে সঞ্চালক নিলুফার জেরিন সমাজের সকল ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে পার্থক্য তৈরি না করে সর্বত্র সাম্যের জয়ধ্বজা ওড়ানোর কথা চমৎকারভাবে তুলে ধরেন।

Facebook Comments Box

Posted ১২:৪৫ এএম | সোমবার, ২০ মার্চ ২০২৩

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

NSM Moyeenul Hasan Sajal

Editor & Publisher
Phone: +1(347)6598410
Email: protidinkar@gmail.com, editor@protidinkar.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।