শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে
শিরোনাম >>

ই-বর্জ্যের নীরব বিপর্যয় এবং সবুজ রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   236 বার পঠিত

ই-বর্জ্যের নীরব বিপর্যয় এবং সবুজ রাজনীতি

বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক শিল্প অভূতপূর্ব গতিতে এগোচ্ছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের ইলেকট্রনিক ও বৈদ্যুতিক শিল্পের বাজারমূল্য ২০২৫ সালের মধ্যে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে। এর মধ্যে কনজিউমার ইলেকট্রনিকস খাতের মূল্যই প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে যাবে। দ্রুত নগরায়ণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রসার, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও গৃহস্থালি যন্ত্রের চাহিদা এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি।

এই উন্নয়নের অন্য পিঠে জমছে এক নীরব বিপর্যয়; ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য সংকট। কয়েকটি গবেষণাপত্র থেকে দেখা যায়, প্রতিবছর দেশে ২৭ থেকে ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর ৩ শতাংশেরও কম নিরাপদভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাকি অংশ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলে দেওয়া হয় যত্রতত্র। বিষাক্ত ধাতু মিশে যায় মাটি, পানি ও বাতাসে। আরও দেখা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাটিতে সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা নিরাপদ সীমার বহু গুণ। সেখানে কর্মরত শিশুসহ দরিদ্র শ্রমিকদের অনেকেই শ্বাসকষ্ট, ত্বক ও স্নায়ুজনিত রোগে ভুগছেন।
বাংলাদেশ ২০২১ সালে ‘বিপজ্জনক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ প্রণয়ন করলেও এর বাস্তবায়ন দুর্বল। পর্যাপ্ত পরিদর্শক নেই; স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা নিরাপদ পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র ও সংগ্রহ ব্যবস্থা সীমিত। ফলে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেবল নীতিগত কাঠামোয় বন্দি থেকেছে।

সম্ভাবনার দুয়ার
ই-বর্জ্য কেবল বিপদ নয়, বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বটে। প্রতিটি সার্কিট বোর্ডে তামা, রুপা ও স্বর্ণের মতো মূল্যবান ধাতু থাকে, যা নিরাপদ প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরুদ্ধার সম্ভব। উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে ই-বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করছে। যাকে বলা হচ্ছে ‘সার্কুলার ইকোনমি’। সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ চাইলে এই খাত থেকে বছরে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় এবং লক্ষাধিক সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। এখন প্রয়োজন রাজনীতির দূরদৃষ্টি। নির্বাচনের মৌসুমে রাজনৈতিক দলগুলো নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। অথচ এটাই ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। এ জন্য প্রয়োজন ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি-ইপিআর’। অর্থাৎ উৎপাদক বা আমদানিকারককেই তাদের পণ্যের পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির দায় নিতে হবে।

রাজনৈতিক দলের সবুজ ভাবনা
ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা সামনে রেখে এখন পর্যন্ত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিএনপিকেই বেশি সরব দেখা যাচ্ছে। দলটির ‘গ্রিন রিকভারি প্ল্যান’ বা সবুজ পুনরুদ্ধার কর্মপরিকল্পনায় শুধু গাছ লাগানো বা নদী ও খাল পুনরুদ্ধার নয়; বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। সামগ্রিক সবুজ অর্থনীতি গড়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দলটির পরিকল্পনায় পরিবেশ রক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের তিন লক্ষ্যকে এক সূত্রে গাঁথা হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি তাদের ২৪ দফায় পরিবেশ নিয়ে ভবিষ্যৎমুখী কথা বলেছে। বিশেষত নগর পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য হবে দূষণ হ্রাস। তবে ২৪ দফা ঘোষণার পর এ নিয়ে তেমন আলোচনা চোখে পড়ছে না।

সবুজ রাজনীতির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা
বিএনপি বা এনসিপির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে হবে। যেমন সম্ভাব্য রূপরেখা হতে পারে দেশব্যাপী আঞ্চলিক ই-বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র গঠন, পাশাপাশি জাতীয় মনিটরিং অ্যাপ চালু করা। এর মাধ্যমে নাগরিকরা পুরোনো ডিভাইস ফেরত দিতে এবং সরকার বর্জ্যের গতিপ্রকৃতি ট্র্যাক করতে পারবে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও হবে অপরিহার্য পদক্ষেপ। আর ‘সার্কুলার ইকোনমি’ নীতি কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, যুবসমাজের কর্মসংস্থানেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চাই নির্দিষ্ট লক্ষ্য, বরাদ্দ, আইনি কাঠামো ও বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

বস্তুত ভবিষ্যতের বাংলাদেশে পরিবেশ ও উন্নয়নকে আলাদা করে দেখা যাবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু অভিযোজন ক্ষমতার পালাবদল সত্ত্বেও অবিচ্ছিন্নভাবে চলা উচিত। সব রাজনৈতিক দলকেই একমত হতে হবে– পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশেই সম্মিলিত ভবিষ্যৎ। একদিকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে সেই স্মার্ট ডিভাইসের বিষাক্ত বর্জ্যের মধ্যে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে রাজনীতিতে চাই নতুন সবুজ দর্শন। এখানে ‘সবুজ’ মানে শুধু গাছ বা খেলার মাঠ নয়; বরং ন্যায়, জবাবদিহি ও উন্নয়নের দিকনির্দেশনা।
বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। আমরা চাইলে ই-বর্জ্যের পাহাড়কে মূল্যবান সম্পদের খনিতে পরিণত করতে পারি অথবা অবহেলায় তা বিষের আঁধারে রূপ নিতে পারে। সব রাজনৈতিক দল মিলেই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ টেকসই সমৃদ্ধির পথ শুরু হয় মাটি, পানি ও বাতাসকে পরিষ্কার করার মধ্য দিয়েই।

Facebook Comments Box

Posted ৪:১৩ পিএম | বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

না ভোটের অধিকার
(393 বার পঠিত)
মোদির নতুন চাল
(380 বার পঠিত)
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

NSM Moyeenul Hasan Sajal

Editor & Publisher
Phone: +1(347)6598410
Email: protidinkar@gmail.com, editor@protidinkar.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।