নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | 254 বার পঠিত

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে চার হাজার ১০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করেছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বেসরকারি কিছু কোম্পানির সঙ্গে সরকারের চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু এ জন্য ভূমি কোত্থেকে আসবে, সে-সংক্রান্ত সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনা বা নীতিমালার কথা কেউ বলতে পারছেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা পরিসরে সর্বনিম্ন ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্তত ৫০ একর ভূমি প্রয়োজন। অন্যদিকে দেশে চাষযোগ্য ভূমির বাইরে অন্য কাজে ব্যবহারের জমি– যাকে বলা যায় বিরান ভূমি, খুবই কম। ফলে কোপটা গিয়ে পড়ছে চাষযোগ্য জমির ওপর, যা থেকে বাংলাদেশের ভাতের গামলা (রাইস বোল) বলে খ্যাত হাওর রক্ষা পাচ্ছে না। মৌলভীবাজারের পুবের হাওর তেমনি একটি কোপের শিকার।
কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন নিয়ে বহু বছর ধরেই কথা হচ্ছে। হাওর রক্ষা আইন নিয়েও আলোচনা থেমে নেই। কিন্তু কোনোটাই আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসে এসব নিয়ে বহু কথা বললেও অগ্রগতি প্রায় শূন্য। গত সরকারের পক্ষ থেকে বহুবার কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। হাওর নিয়েও এমন নির্দেশনা কম ছিল না। বর্তমান সরকার সেসব নির্দেশনা তুলে নিয়েছে– এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে ওইসব নির্দেশনার বাস্তবায়ন যাদের দায়িত্ব, তারা আগের মতোই অন্যত্র ব্যস্ত। অভিযোগ আছে, ক্ষেত্রবিশেষে তারা বরং জমিখেকোদের সহায়তা করেন। কখনও শেষোক্তদের রাজনৈতিক-আর্থিক প্রভাবের কাছে নত হয়ে, কখনও তাদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের কারণে। পুবের হাওরের ক্ষেত্রে কোনটা ঘটেছে, তা জানি না।
জেলার সদর উপজেলার পশ্চিমের ৪ নম্বর আপার কাগাবালা ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম আথানগিরি, নোয়াপাড়া ও মোকামবাড়ি। বাসিন্দাদের প্রায় সবাই কৃষিজীবী, যারা এ অঞ্চলের একমাত্র হাওর– পুবের হাওরের ওপর নির্ভরশীল। এ হাওরই তাদের ভাত ও মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের একমাত্র উৎস। বছর দেড়েক আগে স্থানীয় দালালদের যোগসাজশে একটি বেসরকারি কোম্পানি এ হাওরের এক-চতুর্থাংশ ভূমি ক্রয় করে (জাল কিছু দলিল থাকার অভিযোগ রয়েছে) ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ শেষ। প্রকল্পটি আগামী দু-এক মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে। এখন আবার একই হাওরে আরও ২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একই কোম্পানি দেদার ভূমি ক্রয় করছে। এ প্রেক্ষাপটে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পুবের হাওরের সম্পূর্ণ কৃষিভূমি ও জলাভূমি শেষ হয়ে যাবে। এ হাওরে আর না ফলবে ধান; না উৎপাদন হবে প্রাকৃতিক মিঠাপানির মাছ! পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে এমন হাওর ও পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ না করলে কি (১০+২৫) ৩৫ মেগাওয়াট হতো না? এমন উন্নয়নে উল্লিখিত তিন গ্রামের গরিব কৃষকদের জন্য হরিষে বিষাদ নেমে এসেছে। জমি তো তারা বিক্রয় করেছেন টাকার জন্য। বাজারদরের চেয়ে একটু বেশিই দাম পেয়েছেন। সৌরবিদ্যুৎ তাদের কী কাজে লাগবে, সেটাও দালালরা বুঝিয়েছে তাদের। কিন্তু তারা তখন বুঝতে পারেননি, কীভাবে তাদের আহারের সংস্থান কেড়ে নেবে ওই কেন্দ্র।
কৃষকরা না হয় বোঝেননি। স্থানীয় প্রশাসন কী করেছে? কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার এলাকাবাসীর জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, অন্তত পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে, তা তো তাদের বুঝিয়ে বলা যেত।
দেশের শাসকগোষ্ঠী ও আমলাতন্ত্র কি কোন সম্পদ কোন কাজে ব্যবহার করা হবে, এ নিয়ে কখনও ভাবে? অন্তত বর্তমান সরকার তো এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটাতে পারত। তবে দুঃখজনক হলো, সংস্কারের কথা জপতে জপতে এ সরকার বিদ্যমান উন্নয়ন ধারণায় বিন্দু পরিমাণ হেরফের করেনি। আমরা সবাই জানি, দেশে ভূমি সম্পদ সীমিত। এই সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারই তো সুশাসনের অংশ, যে-কথা উপদেষ্টাদের অনেকেরই ধ্যান-জ্ঞান বলে সবাই জানত।
চা বাগান, হাওর, পাহাড়, টিলা, নদী, খাল, বিলের সমন্বয়ে গঠিত মৌলভীবাজার জেলা। অপরিকল্পিত আবাসন ও শিল্পকারখানা ইতোমধ্যে জেলার বহু টিলা ধ্বংস করেছে; নদী-খাল-বিল দূষিত করেছে। আলোচ্য পরিবেশ বিধ্বংসী উন্নয়ন চললে একদিন হয়তো হাওরও থাকবে না। কেউ কি নেই পুবের হাওর বাঁচানোর জন্য?
Posted ১:৫৪ পিএম | শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Best BD IT
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।