শিক্ষা ডেস্ক | মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | 0 বার পঠিত

কোথাও কোমরপানি ভেঙে, কোথাও নৌকা, আবার কোথাও ভ্যানে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে হাজির হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকেই ভেজা পোশাক, ভেজা জুতা-মোজা এবং ভেজা প্রবেশপত্র নিয়েই তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। টানা ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলমান রাখায় এমন দুর্ভোগে পড়ে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়েছেন দেশের লাখো পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা।
লঘুচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারাদেশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এই দুর্যোগের ভেতরেও পরীক্ষা স্থগিত না করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সব শিক্ষা বোর্ড, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।
গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন বন্যাকবলিত পাঁচ জেলার পরীক্ষা স্থগিত থাকলেও দেশের বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে সূচি অনুযায়ীই পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা হয়।
‘ট্রমা’ নিয়েই পরীক্ষার হলে
এদিন ভোর থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির সঙ্গে বেড়ে চলে জলাবদ্ধতা। কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় স্বজনদের কাঁধ ধরে পানির মধ্যে হেঁটে পরীক্ষাকেন্দ্রে গেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার মেয়েটা পুরো শরীর ভিজিয়ে কেন্দ্রে ঢুকেছে। এমন অবস্থায় তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দেওয়া কি সম্ভব?’ আরেক অভিভাবকের ভাষায়, সন্তানরা ট্রমার মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের মানসিক অবস্থার কথা কেউ ভাবেনি।
শিক্ষামন্ত্রীর ফেসবুক পেজে ক্ষোভের বন্যা
বৈরী আবহাওয়াতে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করায় সামাজিক মাধ্যম প্রতিবাদ, ট্রল ও মিমে সয়লাব হয়ে গেছে। চিকিৎসক ও অ্যাক্টিভিস্ট সাদিকুর রহমান সাদাব তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অমানবিক।’ লেখক সাদমান আব্দুল্লাহ বলেন, ‘পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।’ ডাকসু নির্বাচনে আলোচনায় আসা ছাত্রনেতা শামীম হোসেন ফেসবুকে লেখেন, ‘সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেও শিক্ষামন্ত্রীর পরিবর্তন প্রয়োজন।’
শিক্ষাবিদরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘কোমরপানি পেরিয়ে কেউ পরীক্ষা দিতে যাবে, আবার অন্য কেউ স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেবে– এসব কোনোভাবেই সমতাভিত্তিক মূল্যায়ন নয়।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদের মতে, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল।’ গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই ধরনের সংকট দেখা দেয়। দীর্ঘ মেয়াদে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিবেচনা এবং দুর্যোগকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাপনার একটি জাতীয় পরিকল্পনা জরুরি।’
দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এতসব সমালোচনার মধ্যেই বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোথাও পরীক্ষা স্থগিতের প্রয়োজনীয়তা তাদের জানানো হয়নি। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান গতকাল বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র অবশ্য জানিয়েছে, ‘দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। কিন্তু কোন কোন এলাকায় পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত পূর্বঘোষিত সূচি বহাল রাখা হয়।’ তবে কুমিল্লা সদর উপজেলার ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরা বলছেন, ‘পরীক্ষা স্থগিত বা কেন্দ্র পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষা বোর্ডের। ভোরের পর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির বিবৃতি
বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে গতকাল রাতে একটি বিবৃতি দিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানদের সংগঠন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও কেন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে– এ বিষয়ে অনেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের বিষয়টি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এই উদ্বেগ তারা আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করে।
বন্যায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের অধিকাংশ পরীক্ষাকেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরীক্ষা গ্রহণের পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন প্রতিবেদন প্রেরণ করেছে। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কুমিল্লায় পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তন
মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই গতকাল ডুবেছে কুমিল্লা। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজ এবং জেলার আরও কয়েকটি কেন্দ্রে বারান্দাতেও পানি ঢুকে পড়ে। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীরা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে অনেক পরীক্ষার্থী ঠিক সময়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেনি।
এই কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহসিনবলেন, ‘এখানে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের এক হাজার ৩০৯ জন পরীক্ষা দিচ্ছে। নিচতলার কক্ষে পানি ওঠায় শিক্ষার্থীদের ওপরের ফ্লোরে নেওয়া হয়।’ কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুসারে এ কেন্দ্রটি অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।’
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, তিনি সিটি করপোরেশনের কর্মীদের নিয়ে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে প্রবেশ ও বের হতে নৌকা নিয়ে সহায়তা করেছেন।
Posted ৫:১৫ পিএম | মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।