নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 221 বার পঠিত

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৫-৯৬ সেশনে ভর্তি হই। চার বছরের বিবিএ ও এক বছরের এমবিএ করতে সাত বছর লেগে যায়। কারণ সেশনজট, যার উৎপত্তি ছিল মূলত রাজনীতি।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রথম দিন থেকেই আমাকে হলে থাকতে হয়েছে, যদিও প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বৈধভাবে হলে থাকার বিধান ছিল না। প্রায় সাত বছরের হল–জীবনে আমার সুয়োগ হয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ, দুই আমলের ছাত্ররাজনীতি প্রত্যক্ষ করার। ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ যা করেছে, তার মধ্যে ভালো কাজের উদাহরণ একেবারেই কম।
জোরপূর্বক মিছিলে নিয়ে যাওয়া ছিল অতি স্বাভাবিক। আমাকেও অনেকবার যেতে হয়েছে। মিছিলের আগে হলের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিত এবং সবাইকে গেটে একত্র করে মিছিলে নিয়ে যেত। মিছিলে না গেলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটত। আমারও একদিন মিছিলে যোগ দিতে দেরি হওয়ায় এক নেতার মুখ থেকে গালি শুনতে হয়েছে। একবার মিছিলে গিয়ে পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গাস থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাই। এ রকম ঘটনার মুখোমুখি হয়ে মাঝেমধ্যে হলের ছাদে গিয়ে কান্না করতাম।
ছাত্রনেতারা তাদের সিটে একা থাকত অথচ অন্যদের কক্ষে জোরপূর্বক ডাবলার উঠিয়ে দিত। হলের ক্যানটিনে ফাও খাওয়া ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। বড় নেতাদের রুমে ক্যানটিন থেকে খাবার পৌঁছে দিতে হতো। তারা কখনো ক্যানটিনে খেতে এলে তাদের টেবিলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বসতে সাহস পেত না।
আমাদের সময়ে এক হলের সঙ্গে আরেক হলের মারামারি ও হল দখলের ঘটনাও ছিল স্বাভাবিক। হলগুলো দখলে রাখতে সারা রাত অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিতে হতো। যেসব শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষে রাজনৈতিকভাবে হলে উঠত, তারাই মূলত এসব কাজ করত। তাদের মিছিলে যাওয়াও ছিল বাধ্যতামূলক। হলে ডাবলার হওয়ার বিনিময়ে অনেককেই তাদের প্রথম বর্ষের অনেকটা সময় এসব কাজ করে কাটাতে হয়েছে। এ কারণে অনেকেই প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য হয়েছে কিংবা ভালো ফল নিয়ে পাস করতে পারেনি। এই রাজনীতি করেই আমাদের কয়েকজন ক্লাসমেট অকৃতকার্য হয়েছে। তাদের মধ্যে মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া শিক্ষার্থীও ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিটি বিভাগের পাঠ্যসূচি এমনভাবে তৈরি করা, যাতে একজন শিক্ষার্থীকে মোটামুটিভাবে পাস করতে হলেও দৈনিক চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হয়। অনেকগুলো বিভাগে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ এতই কম যে তারা মাসেও একবার বই ছুঁয়ে দেখে না। এসব শিক্ষার্থী তাহলে বাকি সময়ে কী করবে?
যখন হলে বৈধ সিট পাই, আমি আমার সিটে একা থাকতে পারিনি। আগে থেকেই একজন আমার সিটে থাকত এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে ডাবলার হিসেবে নিয়েছি। দুই সিটের রুমের অন্য সিটে একজন ছাত্রনেতা থাকত। ওই নেতার কারণেই আমাকে ডাবলার নিতে হয়েছে। আমার ডাবলার হওয়ার বিনিময়ে সে ওই নেতার ফুটফরমাশ খাটত। পরবর্তী সময়ে সে বড় সাংবাদিক হয়েছে এবং বর্তমানে বিদেশে থাকে।
আমার রুমে নেতা থাকার কারণে পাতি নেতারা এসে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে আমার পড়ার ব্যাঘাত ঘটাত। অল্প সময়ের ব্যবধানে সিঙ্গেল রুমের জন্য আবেদন করি। এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করায় ও এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলের কারণে তৃতীয় বর্ষের শুরুতেই সিঙ্গেল রুম পেয়ে যাই। সিঙ্গেল রুম পেলেও কখনোই একা থাকতে পারিনি। জোর করে উঠিয়ে দেওয়া ডাবলার নিয়েই হল–জীবন কাটিয়ে দিতে হয়েছে।
এই নেতারা কেউ কেউ আবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দিত না। পরবর্তী জীবনে ব্যাংকের বড় ঋণখেলাপি হওয়ার হাতেখড়ি এখানেই হয়ে যেত। তাদের জন্য রুমমেটের সাবান, টুথপেস্ট, টাওয়েল ব্যবহার ছিল প্রায় অধিকারের মতো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যখন হল ছাড়ি, তখন মনে হয়েছে, এই পাপিষ্ঠদের হাত থেকে বোধ হয় মুক্তি মিলেছে।
এরপর ২০০৬ সালের প্রথম দিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে অল্প সময়ের জন্য বিএনপি ও দীর্ঘ সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের শাসন দেখেছি। যে বেতনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি, তাতে ক্যাম্পাসের বাইরে ভাড়া বাসায় থেকে জীবনযাপন কঠিন বিধায় হাউস টিউটর হওয়ার জন্য আবেদন করি। কারণ, হাউস টিউটর হলে একটু কম ভাড়ায় হলের বাসায় থাকা যায়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা আবেদন করতে থাকি, কিন্তু হাউস টিউটর হতে পরিনি। তারপর পিএইচডি করে বিদেশ থেকে এসে আবার ২০১২ সাল থেকে আবেদন করতে থাকি। আমার আর হাউস টিউটর হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। সাদা দলের (বিএনপি) কাছে আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ স্পষ্ট ছিল না। আর নীল দল (আওয়ামী লীগ) বলেছে, আমার কথাবার্তা সরকার ও উন্নয়নবিরোধী।
Posted ২:১৭ পিএম | রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Best BD IT
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।