বিনোদন ডেস্ক | বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 5 বার পঠিত

প্রতিবছর দুই ঈদকে কেন্দ্র করে সিনেমা মুক্তির হিড়িক পড়ে। গত কয়েক বছর ধরে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও ঈদুল ফিতর সামনে রেখে মুক্তির প্রস্তুতিতে রয়েছে ডজনখানেক ছবি। ঈদের কয়েক মাস আগে থেকেই এসব সিনেমা শিরোনামে আসে; সামাজিক মাধ্যমেও চলে জোর প্রচার-প্রচারণা। তবে প্রেক্ষাগৃহ সংকটের বাস্তবতায় একসঙ্গে এত বেশি সিনেমা মুক্তির ঘোষণা ব্যবসায়িক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ কেউ আবার প্রশ্ন তুলছেন, ঈদকেন্দ্রিক এই হুড়োহুড়ি দীর্ঘমেয়াদে চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য কতটা ইতিবাচক?
দীর্ঘ হচ্ছে সিনেমার তালিকা
দেখতে দেখতে ঘনিয়ে আসছে ঈদুল ফিতর। রমজান শুরু হতেই চলচ্চিত্রপাড়ায় শুরু হয়েছে ঈদের ছবির তোড়জোড়। যতই দিন যাচ্ছে, ততই দীর্ঘ হচ্ছে মুক্তির তালিকা। এখন পর্যন্ত ঈদে মুক্তির ঘোষণা দিয়েছে যেসব ছবি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— শাকিব খান ও তাসনিয়া ফারিণ অভিনীত ‘প্রিন্স: ওয়ানস আপন অ্যা টাইম ইন ঢাকা’; আফরান নিশো, পূজা চেরি ও চঞ্চল চৌধুরীর ‘দম’; সিয়াম আহমেদ ও সুস্মিতা চ্যাটার্জির ‘রাক্ষস’; সাবিলা নূর ও শরিফুল রাজের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’; বুবলী ও নাজিফা তুষির ‘প্রেশার কুকার’; আদর আজাদ ও বুবলীর ‘পিনিক’; নুসরাত ফারিয়া ও তানিয়া বৃষ্টির ‘ট্রাইব্যুনাল’; নাবিলা ও খায়রুল বাসারের ‘বনলতা সেন’; শম্পা রেজা ও জান্নাতুল পিয়ার ‘রঙবাজার’; প্রমোদ অগ্রাহারি ও তাহমিনা অথৈয়ের ‘হাঙর’; আরিফিন শুভ ও মিমের ‘মালিক’; সজল ও অপুর ‘দুর্বার’; সিফাত আমিন ও রাফাহ তোরসার ‘কাট পিস’; পরীমণির ‘ডোডোর গল্প’; ববির ‘তছনছ’ এবং মাহিয়া মাহি ও ডিএ তায়েবের ‘অফিসার’। সংশ্লিষ্টদের ইঙ্গিত, তালিকায় আরও কয়েকটি নতুন নাম যুক্ত হতে পারে।
হল সংকট ও শঙ্কা
বিপুল সংখ্যক এই সিনেমার ভিড়ে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেক্ষাগৃহের স্বল্পতা। বর্তমানে দেশে নিয়মিত চালু থাকা হলের সংখ্যা মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি। ঈদ এলে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫০টির মতো; যার মধ্যে স্টার সিনেপ্লেক্স-এর সাতটি শাখাও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবছর ঈদে কিছু বন্ধ হল সাময়িকভাবে চালু হলেও তা তিন থেকে চারটির বেশি সিনেমার চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতারা জানান, সারা বছর হলগুলো প্রায় দর্শকশূন্য থাকলেও ঈদে হঠাৎ করেই ছবির ঢল নামে। ফলে সব সিনেমা চালানো সম্ভব হয় না। অনেক ভালো মানের ছবিও পর্যাপ্ত শো পায় না। এতে প্রযোজকদের লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
প্রতিযোগিতা—ইতিবাচক না চাপ?
হল সংকট নিয়ে দর্শকমহলে সংশয় থাকলেও নির্মাতাদের কেউ কেউ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর পরিচালক তানিম নূরের মতে, ভালো মানের সিনেমা বেশি হলে দর্শকের হলমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। প্রতিযোগিতাকে নেতিবাচকভাবে দেখার কিছু নেই—প্রতিটি ছবি তার মেধা অনুযায়ী দর্শক টানবে। ঈদের ছবি ‘রাক্ষস’-এর নির্মাতাও বলছেন, ঈদ আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই সময়ে দর্শকের উপস্থিতি বেশি থাকে, তাই সবাই চাইবেন তাঁর সিনেমা মুক্তি পাক। শেষ পর্যন্ত ক’টি ছবি মুক্তি পায় সেটিই দেখার বিষয়। প্রতিযোগিতা মন্দ নয়—এটি প্রমাণ করে, সিনেমা নিয়ে আমরা লড়ছি। তবে হলের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে সবার ভাবা জরুরি।
ঈদে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া আরেক নির্মাতা রায়হান রাফীর ভাষ্য, ঈদে সিনেমা মুক্তির প্রতিযোগিতা থাকবেই। বাংলা সিনেমার এই প্রতিযোগিতা খারাপ কিছু নয়।
প্রদর্শকদের আক্ষেপ
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, বছরজুড়ে সিনেমা না থাকার পর হুট করে এত ছবির চাপ সামলানো হল মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অনেক ক্ষেত্রে হলের অভাবে কিছু সিনেমা প্রচার ও প্রসারে পিছিয়ে যায়। তিনি জানান, আগামী ঈদে সর্বোচ্চ ১৬০ থেকে ১৮০টি সিঙ্গেল স্ক্রিন খোলা থাকতে পারে। এই হিসাব অনুযায়ী ঈদে সর্বোচ্চ চারটি সিনেমা মুক্তি পাওয়া যুক্তিযুক্ত। বাকি ছবিগুলো পরবর্তী সময়ে আসা উচিত। তবে নীতিমালায় ঈদে সিনেমা মুক্তির সংখ্যা উন্মুক্ত। যে কেউ চাইলে মুক্তি দিতে পারেন। নতুন সভাপতি হিসেবে তিনি ঈদে সিনেমা মুক্তির ক্ষেত্রে কিছুটা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করবেন বলেও জানান।
ফাঁকা আওয়াজের সংখ্যাই বেশি
বিগত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, ঈদে সিনেমা মুক্তির ঘোষণা ব্যাপক থাকলেও শেষ মুহূর্তে অধিকাংশ ছবি পিছিয়ে যায়। অনেকেই মনে করেন, ঈদে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া এখন অনেকটা আলোচনায় থাকার কৌশল। কারণ ঈদকেন্দ্রিক ঘোষণা গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত আলোচনার জন্ম দেয়, তৈরি হয় হাইপ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রচারণা কৌশল নির্মাতাদের জন্য স্বল্প মেয়াদে সুবিধাজনক হলেও দীর্ঘ মেয়াদে দর্শকের প্রত্যাশা ও বাজারের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
যা বললেন সংশ্লিষ্টরা
ঈদ ছাড়া যেসব সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে, তার অধিকাংশকে সিনেমা বলারই যোগ্য নয়। টেলিফিল্মকেও এখন হলে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। দর্শক টাকা দিয়ে এসব দেখতে যাবেন কেন? দর্শকের রুচি বুঝে সিনেমা বানাতে হবে। দর্শকদের এই রুচির কথা ভেবেই ঈদে মুক্তির জন্য কয়েকটা ছবি বানানো হচ্ছে। এখন তাদের সঙ্গে যদি পাল্লা দিয়ে অন্যরাও ছবি মুক্তি দিতে লেগে যায় তাহলে তো বিপদ! আমি মনে করি ঈদে দুই বা তিনটার বেশি সিনেমা মুক্তি পাওয়া মানে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
– ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ,কর্ণধার,মধুমিতা
প্রতি ঈদে দর্শক আশা নিয়ে বসে থাকে বাংলা সিনেমার জন্য। এবারও স্টার সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পাবে কয়েকটি সিনেমা। এখনও বাংলা সিনেমার বেশ চাহিদা আছে। দর্শকরা আশায় বুক বেঁধে আছে ঈদে ভালো সিনেমা আসবে। এ উৎসবে বাংলা সিনেমার জয়জয়কার হবে। কোন কোন সিনেমা দেখাব এখনও তা বলতে পারছি না। ভালো সিনেমাগুলোই চলবে এখানে। ঈদে এলেই বাংলা সিনেমার মুক্তির হিড়িক লেগে যায়। এটি ঠিক নয়। সারা বছর ভালো সিনেমা নির্মাতারা বানালে বছরজুড়েই আমরা তা সিনেমা হলে প্রদর্শন করতে পারতাম। এটি দর্শক ও হল মালিক–উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক।
–মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ,জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক,স্টার সিনেপ্লেক্স
Posted ২:০৪ পিএম | বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।