নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৫ | প্রিন্ট | 366 বার পঠিত

২২ আগস্ট ১৯১১, মঙ্গলবার। ফ্রান্সের বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম বা চিত্রশালা। ৭,৮২,৯১০ বর্গফুটের এই চিত্রশালায় রয়েছে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা ৩৮ হাজার বিখ্যাত আর প্রাচীন শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য।
সোমবার ছিল চিত্রশালার সাপ্তাহিক ছুটি। স্বভাবতই মঙ্গলবারে দর্শক উপস্থিতি ছিল বেশি। সাধারণত চিত্রশালার ফটক সকাল নয়টায় খোলার আগেই একদল পেশাদার শিল্পীর আগমন ঘটে। তাঁরা বিক্রির জন্য চিত্রশালায় থাকা বিখ্যাত ক্ল্যাসিক চিত্রকর্মগুলোর নকল তৈরি করেন। এ সময় চিত্রকর্মের পুনর্মুদ্রণ বা রিপ্রোডাকশনের কোনো উন্নত উপায় না থাকায় বিশ্বের প্রায় সব চিত্রশালায় বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলো নকল করে বিক্রি করা আইনসিদ্ধ ছিল। এসব নকল ছবির মূল খদ্দের ছিলেন সদ্য ধনী হওয়া আমেরিকানরা। আমেরিকা থেকে প্যারিসে আসা অনেক পর্যটক ফেরত যাওয়ার সময় আভিজাত্য প্রমাণের জন্য বিখ্যাত চিত্রকর্মের দু-একটা নকল নিয়ে যেতেন। এ ছাড়া বনেদি ও শৌখিন ইউরোপীয়দের কাছেও নকল ছবির কদর ছিল। বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে মুরিল্লো, রাফায়েল, তিশিয়ান, রুবেন্স, রেনোয়ারের ছবির চাহিদা ছিল বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল লেওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’র। চিত্রশালায় আগত দর্শকদেরও বেশির ভাগের আগ্রহ থাকে মোনালিসার প্রতি। ফলে সেখানে ভিড়ও থাকে বেশি।
চিত্রশালার দ্বিতীয় তলায় সালোঁ কেয়ার গ্যালারিতে মোনালিসাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সালোঁ কেয়ার দৈর্ঘ্যে ২৩ মিটার আর প্রস্থে ৩২ মিটার। এখানে আরও কয়েকটি চিত্রকর্ম আছে। মোনালিসার দুই পাশে আছে তিশিয়ানের আঁকা ‘অ্যালেগোরি অব ম্যারেজ’ আর করেজ্জোর আঁকা ‘দ্য মিস্টিক ম্যারেজ অব সেন্ট ক্যাথরিন’।
মোনালিসা যখন নেই
লুই বেরোদ একজন পেশাদার নকলনবিশ শিল্পী। নকলনবিশ হিসেবে মধ্যবয়সী বেরোদের সুনাম ছিল। এর আগে তিনি মোনালিসাসহ বেশ কয়েকটি বিখ্যাত ছবির নকল করেছেন। প্রায় ১৫ দিন হলো বেরোদ আমেরিকা থেকে বেড়াতে আসা এক পর্যটকের সঙ্গে ভালো টাকার বিনিময়ে মোনালিসা নকলের চুক্তি হয়েছে। কাজের বায়না হিসেবে তিনি মোটা টাকাও নিয়েছেন। নকলনবিশরা চিত্রশালার দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে প্রবেশ করে চিত্রকর্মের সামনের ভালো স্থান বেছে নিয়ে কাজ শুরু করে দেন। দর্শকের ভিড় বাড়ার আগেই তাঁরা তাঁদের কাজ যতটা পারেন এগিয়ে নেন। বেরোদ প্রতিদিনই চিত্রশালায় সকাল সকাল হাজির হয়ে কাজটি দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছেন। সরকারি ছুটির দিন হিসেবে রোববারে দর্শকসমাগম বেশি হয়। তাই এদিন পেশাদার শিল্পীদের কাজের সুযোগ দেওয়া হয় না। আবার সোমবার ছিল চিত্রশালার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে বেরোদ পরপর দুই দিন কাজ করতে পারেননি। তাই মঙ্গলবার সকাল সকাল তিনি চিত্রশালায় চলে আসেন। বলতে গেলে তিনিই সালোঁ কেয়ারে প্রথম প্রবেশ করেন।
বেরোদ গ্যালারিতে ঢুকে দেখেন যে মোনালিসা তার স্বস্থানে নেই। তিনি বেশ অবাক আর বিরক্ত হন। বেরোদ জানতেন, এ ধরনের চিত্রকর্মগুলোকে কখনো কখনো ছবি তোলার জন্য ফটো স্টুডিওতে নেওয়া হয়, আবার কখনো অন্য গ্যালারিতে বদলি করা হয়। বেরোদের আর তিন-চার দিনের কাজ বাকি আছে। কাজ শেষ করতে দেরি হলে মক্কেল থেকে বাকি টাকা পেতেও দেরি হবে। তাই বেরোদ একটু মনঃক্ষুণ্ন হলেন। মনে মনে বললেন যে তাঁর কাজের শেষবেলায় মোনালিসাকে সরানোর কি প্রয়োজন ছিল?
বিস্ময় আর বিরক্তি নিয়ে বেরোদ গ্যালারির প্রবেশমুখে থাকা নিরাপত্তাকর্মী মাক্সিমিলান আলফঁস পুপারদ্যাঁর কাছে গেলেন। মোনালিসার অনুপস্থিতির বিষয়ে প্রশ্ন করলেন তাঁকে। পুপারদ্যাঁ গ্যালারিতে ঢুকে দেখলেন, মোনালিসাকে টাঙানোর চারটি আংটা বা হুক যথাস্থানে আছে কিন্তু মোনালিসা নেই, জায়গাটা ফাঁকা। এবার বিস্ময় হওয়ার পালা পুপারদ্যাঁর। এই গ্যালারির দায়িত্ব তাঁর, এখান থেকে মোনালিসাকে সরানোর কোনো পরিকল্পনা থাকলে তাঁর অবশ্যই জানার কথা। আতঙ্কে তাঁর ঘাম বের হতে লাগল। তিনি ছুটলেন নিচতলায় ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জর্জ বেনেদেতের কার্যালয়ে। পুপারদ্যাঁ পরিচালকসহ ফিরে এলেন মোনালিসার গ্যালারিতে। মোনালিসার শূন্যস্থান দেখে বেনেদেতের চোখও ছানাবড়া। হতভম্ব বেনেদেত ছুটলেন প্যারিসের পুলিশপ্রধান লুই লেপ্যাঁর কাছে।
এদিকে দর্শক উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। মোনালিসাকে দেখতে না পেয়ে তাঁদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কেউ কেউ উষ্মা প্রকাশ করছেন। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। শত শত ডলার বা পাউন্ড খরচ করে বিদেশি দর্শকেরা এসেছেন ‘মোনালিসা’কে দেখতে, তাঁরাও অস্থির হয়ে পড়েছেন।
Posted ৪:৪০ পিএম | সোমবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৫
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Best BD IT
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।