নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 266 বার পঠিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২টি স্থানে ইউনিফরম ও সাদা পোশাকে দুই হাজার ১০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া তিনটি স্থানে রয়েছে রিজার্ভ ফোর্স। দায়িত্ব পালন করবেন পর্যাপ্ত র্যাব এবং বিজিবি সদস্য। নির্বাচনের আগে ও পরে মোট তিন দিন পুলিশের কঠোর অবস্থান থাকবে। নির্বাচন উপলক্ষ্যে সোমবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার পর্যন্ত অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন ঘিরে কোনো ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নেই। তবে একজন ভোটারের ভোট দিতে ১-৮ মিনিট পর্যন্ত সময় লেগে গেলে ভোটারদের সারি দীর্ঘ হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া সাইবার জগতে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা হতে পারে। সাইবার হামলা বন্ধে ইতোমধ্যে গুজব ছড়ানো বেশকিছু আইডি বন্ধ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ইউনিট। ক্যাম্পাসে লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন ধাপে ৩২ স্থানে পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম ধাপের বেষ্টনীতে রয়েছে-শাহবাগ মোড়, ঢাবি কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন গেট, দোয়েল চত্বর, শিক্ষা ভবন ক্রসিং, একুশে হল গেটসংলগ্ন ক্রসিং, চানখাঁরপুল ক্রসিং, রোমানা ক্রসিং (কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংলগ্ন), বকসি বাজার ক্রসিং, জগন্নাথ হল ক্রসিং, পলাশী মোড় ক্রসিং, নীলক্ষেত গণতন্ত্র মুক্তি তোরণ গেট। দ্বিতীয় ধাপের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রয়েছে-টিএসসি রাজু ভাস্কর্য, মেট্রোরেল স্টেশন, রমনা কালিমন্দির গেট, শিববাড়ি ক্রসিং, শামসুর নাহার হল গেট ক্রসিং, ভিসি চত্বর, মল চত্বর, ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে, প্রক্টর অফিস, ডাকসু ভবন, মধুর ক্যান্টিন। তৃতীয় ধাপের নিরাপত্তা বেষ্টনী রয়েছে-ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অফিস, ভিসি অফিস ও ভোটকেন্দ্রগুলো। এছাড়া পুলিশের স্ট্রাইকিং বা রিজার্ভ ফোর্স মোতায়েন রয়েছে শাহবাগ, টিএসসিসংলগ্ন সড়কদ্বীপ ও ভিসির বাসভবনের সামনের সড়কে।
সূত্র জানায়, বহিরাগত ব্যক্তি বা অস্ত্রধারী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শাহবাগ মোড়, দোয়েল চত্বর, শিক্ষা ভবন ক্রসিং, চানখাঁরপুল, রোমানা, বকসি বাজার, পলাশী ও নীলক্ষেত এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে চেকপোস্ট। চেকপোস্ট বসানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও অভ্যন্তরীণ এলাকায় চলাচলের সংযোগস্থল ও গুরুত্বপূর্ণ গেটগুলোতে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় মসজিদ গেট, একুশে হল গেট এবং জগন্নাথ হল গেট।
সূত্র আরও জানায়, ভুয়া ভোটার চিহ্নিত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয় পত্র কিউআর কোড স্কানিং করা হবে। ভোটার নম্বর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সার্ভারে ভোটার যাচাই করা যাবে।
সোমবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ডিএমপির অস্থায়ী পুলিশ কন্ট্রোল রুমে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, আগামীকাল (আজ) নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট জোরদার থাকবে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না বলে আশা করছি, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। পর্যাপ্ত চেকপোস্টের পাশাপাশি ফুটপেট্রোল ও মোবাইল পেট্রোল বহাল আছে। অফিসারদের সঙ্গে বডিওন ক্যামেরা যুক্ত করে দিয়েছি। বিশেষায়িত টিম, বোম ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াট টিম থাকবে ভোটের দিন। ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্ট কাজ করবে। প্রবেশ গেটগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে আর্চওয়ে। গঠন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা মনিটরিং সেল। কমিশনার বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রদত্ত ক্ষমতা বলে আমি আজ (সোমবার) রাত ৮টা থেকে ১১ তারিখ ১২টা পর্যন্ত এই ক্যাম্পাসে লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি।
ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, ডাকসু নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক সপ্তাহ ধরে নানাবিধ পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। আশা করছি আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) বড় কোনো ঘটনা ঘটবে না। নির্বাচন ঘিরে কোনো নিরাপত্তা শঙ্কাও নেই। ১০ তারিখ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু থাকবে। প্রয়োজনে তা আরও বাড়ানো হবে। আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটার ও অন্যান্য যে কেউ যেন আইন হাতে তুলে না নেন।
যদি অবাঞ্ছিত কেউ ঢুকে তাহলে তাকে যেন পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।
জাল আইডি কার্ড বানানো বিষয়ে কমিশনার বলেন, আমরা তথ্য পেয়েছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া চলমান রয়েছে।
সাইবার বুলিং বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা অত্যাধুনিক যুগ পার করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক শক্তিশালী যে বিকৃত ঘটনা আসছে। আমরা এগুলো নিয়ে কাজ করছি।
এদিকে নির্বাচন সংক্রান্ত এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, মধুর ক্যান্টিন, ভিসি চত্বর এবং মল চত্বর দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতির প্রধান কেন্দ্র ও জমায়েতের স্থান হিসাবে পরিচিত। এই এলাকায় সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে। তাই এসব স্থানে পর্যাপ্তসংখ্যক পোশাকধারী পুলিশ মোতায়েন করা জরুরি। ডাকসু ভবন ও প্রক্টর অফিস থেকে নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই এসব স্থানে বিশেষভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। শামসুন নাহার হল, রমনা কালী মন্দির গেট, শিববাড়ি, নারী শিক্ষার্থীদের হল ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে এসব স্থানে পর্যাপ্ত পোশাকধারী পুলিশ সদস্য ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও মেট্রোরেল স্টেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ভোট গ্রহণের দিন মেট্রোরেলের বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকবে। নির্বাচনি উত্তেজনা বাইরে ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেতে পারে। তাই এসব স্থানে পর্যাপ্ত পোশাকধারী পুলিশ সদস্য ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিএনসিসির ১৮০ জনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান (অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার) মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ছাত্ররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে যাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নাশকতার আশঙ্কা করছি না। ডিবির পর্যাপ্তসংখ্যক সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা পোশাকে থাকবেন। ডিবি সাইবার জগতের গুজব ঠেকাতে কাজ করছে উল্লেখ করে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমাদের সাইবার টিমকে অ্যাসাইন করে দেওয়া হয়েছে। আমরা কিছু কাজ ইতোমধ্যে করেছি। গুজব ছড়ানো কয়েকটি আইডি বন্ধ করেছি। এক্ষেত্রে বিটিআরসির সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত আছে।
সর্বসাধারণের জন্য ডিএমপির বিশেষ নির্দেশনা
এদিকে ডাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে সর্বসাধারণের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সবাইকে এই নির্দেশনা মেনে চলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সোমবার দেওয়া বিশেষ নির্দেশনায় ডিএমপি জানিয়েছে, সোমবার থেকে বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যতীত অন্য কেউ বৈধ বা লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহন করতে পারবেন না। এই সময়ের মধ্যে ক্যাম্পাসে অস্ত্র বহন করা হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। সোমবার থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশদ্বারসমূহ সীমিত থাকবে। এছাড়া সোমবার বিকাল ৪টা থেকে বুধবার পূর্ণ দিবস মেট্রোরেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সব সদস্য, জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বাংলা একাডেমি ও পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চলাচলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার ব্যবহার করতে পারবেন বলে বিশেষ নির্দেশনায় জানিয়েছে ডিএমপি।
চলাচলে ডিএমপির নির্দেশনা : ডাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে যানবাহন চলাচলের নির্দেশনাবলি সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ডিএমপি। সোমবার ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ অনুরোধ করা হয়। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ডাইভারশন প্রদান করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে নিম্নলিখিত ক্রসিংগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যানবাহন প্রবেশ নিয়ন্ত্রণপূর্বক ডাইভারশন প্রদান করা হবে। সেগুলো হলো-শাহবাগ ক্রসিং, হাইকোর্ট ক্রসিং, নীলক্ষেত ক্রসিং, শহীদুল্লাহ হল ক্রসিং ও পলাশী ক্রসিং।
যানবাহন চলাচলের বিকল্প রাস্তা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখী যানবাহনগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ না করে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করা হলো। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পরিসেবা এই ডাইভারশনের আওতামুক্ত থাকবে। ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার, ডাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে ঢাকা মহানগরীর যানবাহন চালক ও যাত্রীসাধারণকে উপরোক্ত ক্রসিংসমূহসহ আশপাশের এলাকা/সড়কসমূহ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলাচল করার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সবার সহযোগিতা কামনা করছে।
Posted ১:১২ এএম | মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Best BD IT
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।