মঙ্গলবার ১৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের শঙ্কা গ্রাহকের

জাতীয় ডেস্ক   |   শনিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   54 বার পঠিত

ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের শঙ্কা গ্রাহকের

দুদিন আগে চালু হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যক্রম। অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করছে সরকার। কিন্তু চালুর পরই এনইআইআর ব্যবস্থায় ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে কয়েকশ মোবাইল ফোনের নিবন্ধন করা হয়েছে।

এনআইডি বাদে যে কোনো সিরিয়ালের ১৩ নম্বর প্রবেশ করালেই অনেকের ব্যক্তিগত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন অনেকেই। এতে গ্রাহকরা ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের শঙ্কা করছেন। অনেকে বারবার চেষ্টা করেও এনইআইআর সার্ভারে প্রবেশ করতে পারছেন না। সব মিলিয়ে এনইআইআর ব্যবস্থাপনা নিয়ে শঙ্কা ও ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা।

গত বৃহস্পতিবার চালু হওয়া এনইআইআর কার্যক্রম নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সিস্টেমে ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, তারা ত্রুটি সমাধানের চেষ্টা করছেন।

বিশেষ সহকারীর পোস্টে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত রাহাত কমেন্ট করেন, ‘আমার এনআইডির বিপরীতে ৪২টি ফোন/আইএমইআই নিবন্ধন করা দেখাচ্ছে, যার ি৪০টিই গত ১৮ ডিসেম্বরের পরে করা। এই ৪২টি ফোন/আইএমইআইর একটিও আমার নয়। বিষয়টি খুবই অ্যালার্মিং।’

হাসিনুর রেজা নামে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আমার এনআইডির বিপরীতে ৬৪টি ফোন নিবন্ধন করা। যার মধ্যে ডিসেম্বরেই ২৮টির মতো নিবন্ধিত। অথচ আমি ডিসেম্বরে কোনো ফোন ক্রয় বা নিবন্ধন করিনি। তাছাড়া ওই লিস্টে আমার ব্যবহার করা ফোনের আইএমইআই নেই।’

তিনি নিজের ওয়ালে লেখেন, ‘আমার নামে কতগুলো মোবাইল সেট নিবন্ধন করা আছে, সেটা চেক করতে neir.btrc.gov.bd সাইটে গিয়েছিলাম। আমার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে ৬৪টি মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন করা আছে। অথচ আমার নিজের, পরিবার, বাবা-মায়ের মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর দিয়ে চেক করলাম, সেগুলোর একটিও ওখানে নেই। আর যেগুলো ওখানে আছে, সেগুলো কোথা থেকে আমার এনআইডির বিপরীতে নিবন্ধিত হলো, সেটাই তো জানি না। এমন লেজেগোবরে অবস্থা হলে এনইআইআরের সুফল কীভাবে আসবে?’

মসিউর রহমান নামের আরেক ব্যক্তি একটি স্ক্রিনশট দিয়ে লেখেন, তাঁর এনআইডির বিপরীতে ৮০টি আইএমইআই নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে তাঁর নিজেরটাই নেই।

বিশেষ সহকারীর পোস্টের নিচে শাহীন আলম নামের একজন অ্যাপ ডেভেলপার লেখেন, এই সিস্টেমটা যারা বানিয়েছে, তারা সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান রাখে না।

এ বিষয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব পোস্টে লেখেন, আমরা অপারেটরদের কাছ থেকে প্রায় তিন বিলিয়নের বেশি ডেটা সেট পেয়েছি। অপারেটররা হিস্টোরিক ডেটাসহ সবকিছুই সিস্টেমে তুলেছে। তবে মাইগ্রেশনের তারিখটা এখনকার দেখানো হয়েছে বলে অনেকের এনআইডিতে সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে।

বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে এ বিষয়ে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ধীরে ধীরে হিস্টোরিক ডেটা ব্যাকগ্রাউন্ডে আর্কাইভ করে শুধু বর্তমানে সচল হ্যান্ডসেটের সংখ্যা দেখানো হবে। এ জন্য আমাদের কিছুটা সময় লাগবে।

দেশে এক ব্যক্তির একটি এনআইডির বিপরীতে প্রথমে ২০টি এবং পরে ১৫টি পর্যন্ত সিম ব্যবহারের অনুমতি ছিল জানিয়ে তৈয়্যব বলেন, যা বর্তমানে ১০-এ নামিয়ে আনা হচ্ছে। ফলে এনইআইআর ম্যাপিংয়ে এনআইডির বিপরীতে হিস্টোরিক ডেটায় অনেক বেশি হ্যান্ডসেটের সংখ্যা দেখানো স্বাভাবিক। তবে এর মাধ্যমে সমাজের সচেতনতা তৈরি হবে, ব্যক্তির এনআইডির বিপরীতে কত সিম ব্যবহার হয়েছিল, সিমের বিপরীতে কত ডিভাইস ব্যবহার হয়েছিল জানা যাবে। এসব তথ্য মানুষ জানতে পারবে এবং সচেতন হতে পারবে।

এই নম্বরেই পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৯১ লাখ মোবাইল
এনইআইআর চালুর পর দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে বিপুল পরিমাণ ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বরযুক্ত ডিভাইসের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। আহমদ তৈয়্যবের ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়, নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণে ‘১১১১১১১১১১১১১’, ‘০০০০০০০০০০০০০’, ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’-এর মতো প্যাটার্নসহ লাখ লাখ নকল বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা ডিভাইস চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে সচল রয়েছে। তা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে এসব আইএমইআই ব্লক করা হচ্ছে না; বরং ‘গ্রে’ শ্রেণিতে ট্যাগ করে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে, যাতে হঠাৎ বন্ধে সাধারণ গ্রাহকের অসুবিধা না হয়।
পোস্টে আরও বলা হয়, এসব নিম্নমানের নকল ফোনের কোনো রেডিয়েশন পরীক্ষা, স্পেসিফিক অ্যাবসরপশন রেট (এসএআর) টেস্ট বা নিরাপত্তা যাচাই হয়নি। ফলে ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা– উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়ছে। স্মার্টফোনের পাশাপাশি বিভিন্ন আইওটি ডিভাইসেও এসব ডুপ্লিকেট আইএমইআই ব্যবহৃত হচ্ছে; অপারেটর পর্যায়ে মোবাইল, সিম সংযুক্ত ডিভাইস ও আইওটি ডিভাইসের আইএমইআই আলাদা করা সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। বৈধভাবে আমদানি করা আইওটি ডিভাইস আলাদা করে ট্যাগের কাজ শুরু হয়েছে।

১০ বছরের সামগ্রিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি পুনরাবৃত্ত আইএমইআই হিসেবে ধরা পড়েছে ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’– একক এই নম্বরেই পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি রেকর্ড (বিভিন্ন নথিপত্র, মোবাইল নম্বর ও ডিভাইসের সমন্বয়সহ)। শীর্ষ তালিকার আরও কয়েকটি আইএমইআইয়ে লাখ লাখ ডিভাইস যুক্ত– যেমন ৪৪০০১৫২০২০০০ নম্বরে ১৯ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি, ৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪ নম্বরে ১৭ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি এবং ৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬ নম্বরে ১৫ লাখ ২৩ হাজারের বেশি ডিভাইস। শুধু এক অঙ্কের ‘০’ আইএমইআই নম্বরেই রয়েছে ৫ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি সক্রিয় ডিভাইস।

শীর্ষ সক্রিয় ডুপ্লিকেটগুলোর মধ্যে রয়েছে– ৩৫৪৬৪৮০২০০০০২৫ (৫ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি), ৩৫৮৬৮৮০০০০০০১৫ (৫ লাখ ৩২ হাজারের বেশি), ৮৬৭৪০০০২০৩১৬৬১ (৪ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি), ৮৬৭৪০০০২০৩১৬৬২ (৪ লাখ ১৩ হাজারের বেশি), ১৫১৫১৫১৫১৫১৫১৫ (২ লাখ ১০ হাজারের বেশি), ৩৫৯৪৫৪৭৮৪৯৮১৮৮ (১ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি) এবং ৩৫৪১১২০৮০৬৪৪২৯ (১ লাখ ৩ হাজারের বেশি) ডিভাইস।

বিশেষ সহকারী পোস্টে উল্লেখ করেন, সংখ্যাগুলোই প্রমাণ করে ক্লোন ও নকল ফোনের ছড়াছড়ি কতটা গভীর। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশ ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে। বিটিআরসি ও মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যৌথ তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ই-কেওয়াইসি জালিয়াতির ৮৫ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে। একই বছরে এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি ফোন চুরির অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে; আরও অনেক ঘটনা অভিযোগের বাইরে থেকে গেছে।
তাঁর মতে, বছরের পর বছর নাগরিকদের কাছে আন-অফিসিয়াল ‘নতুন ফোন’ নামে নকল ও নিম্নমানের ডিভাইস বিক্রি– একটি নজিরবিহীন প্রতারণা। এই অবৈধ সরবরাহ চক্রের লাগাম টানা এখন সময়ের দাবি; না হলে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও আর্থিক লেনদেন– সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়তে থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরিফ মহিউদ্দিন বলেন, পুরো প্রস্তুতি নিয়ে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়নি। এতে ব্যবহারকারীরা ভোগান্তির মুখে পড়ছেন। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার আগে এর দুর্বলতা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে কিনা, তা যাচাই করে দেখা দরকার ছিল।

Facebook Comments Box

Posted ৫:০৭ পিএম | শনিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২৬

|

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

(279 বার পঠিত)

এ বিভাগের আরও খবর

ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল সংবাদ এবং তথ্যে আপনার প্রয়োজন মেটাতে

NSM Moyeenul Hasan Sajal

Editor & Publisher
Phone: +1(347)6598410
Email: protidinkar@gmail.com, editor@protidinkar.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।