বিশ্ব ডেস্ক | বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 24 বার পঠিত

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য ইরানিরা ভয়াবহ মূল্য দিতেও প্রস্তুত বলে প্রমাণ মিলেছে। অধিকাংশ মানুষ ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা আর চায় না। তারা একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র চায়।
একটি জরিপের ওপর ভিত্তি করে ইরানিদের এই মনোভাব প্রকাশ করেছে গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য কনভারসেশন’। ‘গ্রুপ ফর অ্যানালাইজিং অ্যান্ড মেজারিং অ্যাটিটিউডস ইন ইরান’ বা গামান নামের সংস্থা জরিপটি চালায় ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে চালানো জরিপে কয়েক ধাপে অংশ নেন ইরানে অবস্থান করা এক লাখের বেশি মানুষ। কেবল গত বছরের সেপ্টেম্বরে (ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর) মতামত দেওয়া অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের বেশি।
কয়েক ধাপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হিসেবে শাসনব্যবস্থা বদলের পক্ষে ছিলেন ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ৪১.৫ শতাংশ। একই বছর নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ৬০.১ শতাংশ (ডিসেম্বর মাসে) অংশগ্রহণকারী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি (৪০.০) ও জুনে (৩৫.৫) তা কমে যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আবার বেড়ে ৪১.৩ শতাংশ হয়েছে।
গামানের পরিচালক আম্মার মালেকি ও বোর্ডের সদস্য পোয়ান তামিমি আরব দ্য কনভারসেশনে লিখেছেন, তাদের জরিপগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখাচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যা চায় না, তা নিয়ে একটি স্পষ্ট ঐকমত্য আছে। প্রদেশ, গ্রাম ও শহর, বয়স এবং লিঙ্গনির্বিশেষে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ভোট দেবেন না।
জরিপ অনুযায়ী, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র থেকে কাঠামোগত পরিবর্তন ও রূপান্তরের’ সমর্থক ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ২৪.৯ শতাংশ। ২০২২ সালে হিজাব পরা নিয়ে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এ বিষয়ের সমর্থক ছিল কম– ১৬.২ শতাংশ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাড়লেও (২৫.২) পরের বছরের সেপ্টেম্বরে কমে ২১.২ শতাংশে নামে।
ইসলামিক বিপ্লবের নীতি ও সর্বোচ্চ নেতার প্রতি সমর্থক ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১৭.৪ শতাংশ। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর সমর্থক ছিল ১১.৪, আর গত বছরের সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে ছিলেন ১১.৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
এবারের বিক্ষোভে ভিন্নতা কী
জরিপের প্রতিটি ধাপেই ইরানের অর্থবহ অগ্রগতির পূর্বশর্ত হিসেবে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান সবচেয়ে জনপ্রিয় মত হিসেবে উঠে এসেছে। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের সময় এই সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। গত বছর ১২ দিনের সংঘাতের পরও শাসন পরিবর্তনের পক্ষে সমর্থন বাড়তে দেখা গেছে।
তবে আগের বিক্ষোভগুলোর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করলে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ১২ দিনের সংঘাতে বেশ কয়েকজন সামরিক কমান্ডার নিহত হওয়ায় শাসনব্যবস্থা সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ইরান এখন দুর্বল। রাষ্ট্র আর বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরিধান চাপিয়ে দিতে পারছে না। অর্থনীতিও নড়বড়ে অবস্থায়, মুদ্রার মান দ্রুত নিচে নামছে।
ইরানিদের বড় একটি অংশের বিশ্বাস, নির্বাচন বা সংস্কারের চেয়ে বিক্ষোভ ও বিদেশি চাপ কিংবা হস্তক্ষেপই রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে বেশি কার্যকর হতে পারে। এ কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প শাসকদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উৎসাহ বাড়ে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
বর্তমান বিক্ষোভকারীরা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থাকে দখলদার শক্তি হিসেবে দেখছে, যা তাদের স্লোগানেও প্রকাশ পেয়েছে। যেমন– ‘আমাদের শত্রু এখানেই, আমেরিকা নয়’ এবং ‘গাজা নয়, লেবানন নয়, জীবন দেব শুধু ইরানের জন্য’।
এই আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন করে সামনে এসেছেন নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি। তাঁর জনপ্রিয়তাকে ‘সবার আগে ইরান’ স্লোগান দেওয়া ব্যক্তিদের মানসিকতার আলোকে বোঝা যায়। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গামানের জরিপে পাহলভির প্রতি সমর্থন মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী তাঁকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দেন। অন্য এক-তৃতীয়াংশ তীব্রভাবে বিরোধিতা করেন। বাকি অংশটি আংশিকভাবে সমর্থন বা বিরোধিতা করেন কিংবা কোনো মতামতই দেননি।
চলমান আন্দোলনে পাহলভিপন্থি স্লোগানের উত্থান দেখা যাচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় তাঁর জনপ্রিয়তা মধ্যপন্থি বা অনিশ্চিত অংশের কিছু মানুষকে আকর্ষণ করছে। তবে পাহলভির জনপ্রিয়তা ইরানের সব এলাকায় সমানভাবে নেই। জরিপ অনুযায়ী, যেসব প্রদেশে জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি (যেমন কুর্দি, আজেরি তুর্কি ও বালুচ), সেখানে তাঁর জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপ বা কাঠামো নিয়ে কোনো ঐকমত্য নেই। যেমন– ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর পরিচালিত জরিপে প্রজাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার প্রতি ২০.৯, রাজতন্ত্রের প্রতি ২৮.৫ ও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সমর্থক ছিল ২০ শতাংশ। তবে বর্তমান ব্যবস্থার (ইসলামিক প্রজাতন্ত্র) বিকল্প কী হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা রাখেন না ২৩.৪ শতাংশ। এটি দেখায়, বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে জোরালো মত প্রকাশ না করা মানুষের সংখ্যা এখনও উল্লেখযোগ্য। তাই যে শক্তি ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে পারবে তারা তাদের প্রস্তাবিত মডেল গ্রহণে সংখ্যাগরিষ্ঠকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাবে।
ইরানিদের বড় অংশ একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা চায়। এক্ষেত্রে সমর্থনের হার ৮৯ শতাংশ। তবে রাজনৈতিক উদারনীতির প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ২০২৪ সালে ৪৩ শতাংশ মানুষ একমত হন– সংসদ ও নির্বাচন নিয়ে মাথা না ঘামিয়েও একজন শক্তিশালী নেতা দেশ চালাতে পারেন। উচ্চশিক্ষা না থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই মনোভাব আরও প্রবল। রাজতন্ত্রপন্থিদের মধ্যে এ হার ৪৯।
গামানের পরিচালক আম্মার মালেকি ও বোর্ডের সদস্য পোয়ান তামিমি আরব লিখেছেন, ইরানিদের উদারনীতি সংক্রান্ত ঘাটতি কমাতে হলে জরিপের তথ্যের বাস্তবতাকে এড়ানোর সুযোগ নেই। জাতীয়তাবাদ এমন এক বিপ্লবী শক্তি তৈরি করতে পারে, যা শাসনব্যবস্থাকে উল্টে দিতে সক্ষম। কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতনের পর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ইরানের সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বৈচিত্র্যকে একটি সত্যিকারের মুক্ত রাষ্ট্রের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে মেনে নেওয়াটাও দরকার।
Posted ৩:৪৮ পিএম | বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।