জাতীয় ডেস্ক | মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 26 বার পঠিত

আজ মঙ্গলবার শুরু হয়েছে টানা সাত দিনের ঈদের ছুটি। লম্বা ছুটির কারণে গত বছরের মতো এবারও ধাপে ধাপে যাত্রীরা রাজধানী ঢাকাসহ শহর ছাড়ছেন। গতকাল সোমবার শেষ কর্মদিবসের পর বাসে-ট্রেনে ভিড় বাড়লেও, ঈদযাত্রার চিরচেনা সেই ঢল নামেনি। আগামীকাল বুধবার কলকারখানা ছুটির পর যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। তবে মালিক-শ্রমিক সব পক্ষই বলছে, জ্বালানি সংকটের কারণে এবার যানবাহন কম। ফলে যানজট না হলেও, যান সংকটে ভোগান্তি হতে পারে।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে। গতবারের মতো এবারও ঈদের আগে চার দিন ছুটি। ঈদের আগে লম্বা ছুটি থাকায় গতবারের মতো স্বস্তির ঈদযাত্রা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, যানজটপ্রবণ ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ অংশ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা অংশ এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশে গতকাল রাত পর্যন্ত যানজট ছিল না। পদ্মা ও যমুনা সেতুতে ছিল একইচিত্র। প্রতিনিধিরা জানান, জ্বালানি সংকটে এবারের ঈদে অন্যান্য বছরের তুলনায় গাড়ি চলছে কম।
মন্ত্রী বললেন ভাড়া বাড়েনি, তেলও আছে
আগের বছরগুলোর মতো এবারও বাসে কৌশলে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। যেসব বাস যাত্রী ধরতে, সারাবছর কম ভাড়া নেয়, সেগুলো এখন শেষ গন্তব্যের সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছে। ফলে কোনো কোনো রুটে ভাড়া বেড়েছে। যদিও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম দাবি করেছেন, ভাড়া বাড়েনি। বরং মালিকরা কম নিচ্ছেন।
নতুন ভোগান্তি তৈরি করেছে জ্বালানি তেল। বাসমালিকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছেন না। পেলেও দীর্ঘ লাইন ধরতে হচ্ছে ফিলিং স্টেশনগুলোতে। এতে বাসের ট্রিপ কমছে। তবে মন্ত্রী বলেছেন, গণপরিবহনে জ্বালানি তেলের সংকট নেই।
সোমবার সকালে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে এসে তিনি বলেছেন, যদি সরকারি ভাড়া ৭০০ টাকা হয়, যাত্রী আকৃষ্ট করতে ১০০ টাকা কমিয়ে মালিকরা ৬০০ টাকা নিতেন, এখনও তাই নিচ্ছেন। নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়ে নজির গত সাত দিনে পাইনি। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জ্বালানি তেলের বিষয়ে শেখ রবিউল বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু সংকট থাকলেও, গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা হয়েছে। তেলের দাম বাড়ছে না এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সময় চারদিক থেকে ‘পাচ্ছে না’ ‘পাচ্ছে না’ বলে জোরালো আওয়াজ শোনা যায়। তখন মন্ত্রী বলেন, তেল পাচ্ছে না–এমন বলার সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত হারে তেল পাচ্ছে। কোথায় তেল পাচ্ছে না, আমাকে জানান। তেল দেওয়ার দায়িত্ব আমার।
কমলাপুরে ভিড় বেড়েছে
আগের দিনগুলোর তুলনায় গতকাল দুপুর থেকে ভিড় বেড়েছে কমলাপুর রেলস্টেশনে। সরেজমিনে দেখা যায়, প্ল্যাটফর্মগুলোতে মিছিলের মতো ভিড়। হুড়োহুড়ি করে যাত্রীরা ট্রেনে উঠছেন। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠার মতো ভিড় ছিল না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে রেলকর্মীরা বলছেন, বুধবার কলকারখানায় ছুটির পর উত্তরবঙ্গ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের যাত্রীর ঢল নামবে। ছাদে যাত্রী উঠবেন। তখন সিডিউল রক্ষা করা আসল চ্যালেঞ্জ।
শেষ কর্মদিবসে আগের তিন দিনের চেয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিটের যাত্রীও বেড়েছে। ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছেড়ে যাওয়া রাজশাহীগামী সিল্ক সিটি এক্সপ্রেসে উঠতে অনেক যাত্রীকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। ট্রেনটির যাত্রী আবু তাহের বলেছেন, এসি কামরার টিকিট কেটেও ভিড়ের কারণে স্ত্রী, সন্তান, মালপত্র নিয়ে উঠতে পারছেন না।
নৌপথে নতুন উদ্যোগ
ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। দুটি নতুন ঘাট দিয়ে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার থেকে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় বিআইডব্লিউটিএ নির্মিত নতুন লঞ্চঘাটের (ল্যান্ডিং স্টেশন) উদ্বোধন করা হয়েছে গতকাল সোমবার। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচলে কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়ায় আগে থেকে চালু থাকা ট্যুরিস্ট ঘাট দিয়েও লঞ্চযাত্রীরা নিজ গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। দুই ঘাটসংলগ্ন এলাকার লঞ্চযাত্রীদের যানজট ঠেলে সদরঘাট আসতে হবে না।
বাস টার্মিনালে ভিড় কম, বাসের অপেক্ষা
রাজধানীর তিনটি বাস টার্মিনালে শেষ কর্মদিবসে যাত্রীর ভিড় বৃদ্ধি পেলেও কয়েক বছর আগেও ঈদযাত্রায় যে ঢল দেখা যেত, তা দেখা যায়নি। গাবতলী থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় চলা হানিফ পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, যানজট না থাকায় বাস নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে যাচ্ছে, ঢাকায় ফিরতে পারছে। কলকারখানা ছুটির পর শ্রমিকদের পরিবহন করা বাস রাস্তায় নামার পর বোঝা যাবে কেমন হবে ঈদযাত্রা।
মহাখালী থেকে চলা ময়মনসিংহগামী বাস, সায়েদাবাদ থেকে চলা সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর বাসের কর্মীরা জানান, যানজট না থাকায় ঈদযাত্রা এখনও স্বস্তির। তবে বাস সংকট থাকায় মহাখালীতে ইউনাইটেড পরিবহনের সামনে টিকিটপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ সারি ছিল। যারা টিকিট কাটেন, তারা দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলেন। পরিবহনটির মালিক সাইফুল আলম বলেছেন, গাজীপুরে ফিরতি পথে যানজট থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে বাস ফিরতে পারেনি। তবে আগের বছরগুলোর তুলনায় এই সংকট কম।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ির চাপ বেড়েছে। তা মোকাবিলায় হাইওয়ে পুলিশ টহল টিম বসিয়েছে। পদ্মা সেতুর মাওয়া ও জাজিরা টোলপ্লাজায় ১৭টি বুথ চালু করে ১৮১টি নজরদারি ক্যামেরা বসিয়েছে সেতু বিভাগ। জরুরি প্রয়োজনে বাড়তি মোটরসাইকেলের উপচে পড়া ভিড় ঠেকাতে মাওয়া প্রান্তে আরো তিনটি সাময়িক বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেতু কর্তৃপক্ষের পদ্মা সেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, সবগুলো বুথ সচল রাখতে অতিরিক্ত টোল কালেক্টর নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি টোল প্লাজায় চালক ও যাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদানের সুবিধার্থে আইটিএসের আওতায় ভ্যারিয়েবল ম্যাসেজ সাইন সুবিধা রাখা হয়েছে।
হাঁসাড়া হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এটিএম মাহমুদুল হক জানান, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চোখে পড়লেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটে গাড়ি কম
গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, যাত্রীর ঢল রোধে জেলার প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্প-কারখানা ধাপে ধাপে সাত থেকে ১০ দিনের ছুটি দেওয়ার হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯৬ ভাগ কারখানায় বেতন ও ৯৪ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ সূত্র বলছে, প্রথম ধাপে সোমবার থেকে এক হাজার কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে ছুটি পাবেন দেড় হাজার কারখানার শ্রমিক। বুধবার ৮০০ এবং বৃহস্পতিবার ২৫০ কারখানার শ্রমিকরা ছুটি পাবেন। গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ায় সড়কে চাপ কমবে।
সন্ধ্যার পর মাওনা চৌরাস্তা ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন আনোয়ার হোসেন নামে এক শ্রমিক। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়ে। ঈদ করতে যাবেন জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে। আনোয়ার হোসেন বলেন, ছুটি পেলেও গাড়ি পাচ্ছেন না।
আলম এশিয়া নামের বাসের চালক মামুন খান বলেন, গাড়িতে তেল নেই। চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার একটি পাম্পে তেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ লাইন। লাইনে থাকা গাড়িগুলোতে তেল নিতে দুই ঘণ্টা লেগে যাবে। পরে মাওনা চৌরাস্তার একটি পাম্পে এসেও একই অবস্থা দেখতে পান। দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়ে গাড়ি ছেড়েছেন।
কুমিল্লা ও দাউদকান্দি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল বিকেলে দাউদকান্দি টোলপ্লাজায় যানবাহনের কিছু চাপ দেখা গেলেও, রাতে পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। যানবাহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকটে এবারের ঈদে ব্যক্তিগত ও অন্য যানবাহনের চলাচল আগের বছরের তুলনায় অনেক কম।
সন্ধ্যায় রাজধানীর আরামবাগ থেকে কুমিল্লায় আস মিয়ামী পরিবহনের চালক আবদুল খালেক বলেন, স্বাভাবিক সময়ের মতোই সোয়া দুই ঘণ্টা লেগেছে।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, কোথাও যানজটের তথ্য নেই। জ্বালানির কারণে যানবাহন কম।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, বন্দরনগরী থেকেও ঈদযাত্রা এখনও স্বস্তির। ভিড় থাকলেও, যানজট শিডিউল বিপর্যয় নেই।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, প্রতিদিন ঢাকা-ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী ট্রেনে করে প্রায় ১০ হাজার মানুষ গন্তব্যে যেতে পারছেন। গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোতে বাড়তি যাত্রী পরিবহনে ‘স্ট্যান্ডিং টিকিট’ বিক্রি করা হচ্ছে।
গতকাল রোববার গরীরউল্লাহ শাহ (রহ.) মাজার এলাকায় কথা হয় ঢাকাগামী যাত্রী রহমান মোরশেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদে বাড়ি ফেরা বরাবরই কষ্টের। তাই স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি ফিরতে এবার কিছুটা আগেভাগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ি ফিরছি। আগের মতো ঝামেলা নাই।’
জ্বালানি সংকটে ঘাটে গাড়ি কম
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সোমবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রীরা স্বাভাবিক দিনের মতোই স্বস্তিতে আরিচায় ফেরি পারপার হয়েছেন। তবে জ্বালানি সংকটে বাস কম চলাচল করছে বলে জানা গেছে। চালকরা বলছেন, পাটুরিয়া ঘাট থেকে গাবতলী যাতায়াতে ৫৫ লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু ফিলিং স্টেশন ২০-৩০ লিটার দিচ্ছে। পাটুরিয়া ঘাটের সেলফি বাসের সুপারভাইজার সোহান বিশ্বাস বলেন, ডিজেল সংকটে কোম্পানির ১০০ বাসের মাত্র ৫১টি চলছে।
Posted ৫:১৮ পিএম | মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।