জাতীয় ডেস্ক | মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 56 বার পঠিত

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় সারাদেশে ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৫৩টি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শিরোনামে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার হত্যাকারী, হত্যার নির্দেশদাতা ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৬৬৩টি মামলায় আসামি হিসেবে নাম এসেছে শেখ হাসিনার। মোট মামলার মধ্যে ৮৩৭টি হত্যা মামলা। এর মধ্যে ৪৫৩টিতে শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে টিআইবি বলছে, সারাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলা হয়। এতে আসামি ১ হাজার ১৬৮ পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬১ পুলিশ সদস্যকে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা পড়েছে ৪৫০টি ও মামলা ৪৫টি। শেখ হাসিনাসহ ২০৯ জন আসামি। গ্রেপ্তার ৮৪ জন। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩ সংশোধন করে রাজনৈতিক দলের বিচার করার সুযোগ করা হয়। দুটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। আরেকটি মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দুটি বেঞ্চে মোট ১২টি মামলা বিচারাধীন, ১০৫ জনের বেশি অভিযুক্ত।
টিআইবি বলছে, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিযুক্ত গোপনে দেশত্যাগ করেন। সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা সংস্থা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তাদের পালাতে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষেত্রবিশেষে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও ঢালাওভাবে মামলায় আসামি করায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এসব মামলায় সারাদেশে প্রায় দেড় লাখ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ হাজার ৮৫৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ১৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৮১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় ৭৫ হাজার ৪০০ জনকে, তবে ৫৫ শতাংশ জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
টিআইবি বলছে, পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা এবং চাঁদাবাজি ও হয়রানির উদ্দেশ্যে আসামি করা হয়েছে। আবার মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নামে চাঁদাবাজি হয়। চাপের মুখে তদন্ত না করে মামলা নেওয়া হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আদালতে আক্রান্ত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে লাঞ্ছিত হন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়া বিচারক ও কৌঁসুলিদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া এবং কিছু অগ্রগতি স্বীকার করলেও টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, মামলার ভিত্তি দুর্বল হওয়া, প্রতিবেদন তৈরিতে পদ্ধতিগত জটিলতা এবং ঘটনার পরিষ্কার চিত্র না থাকায় বিচার প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিচারের রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করলেও সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ন্যায্য ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা হলে বিচারকার্য সম্পাদন ও রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে সমালোচনা হতে পারে। বিচার প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কারণে প্রকৃত অপরাধী দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পুলিশ সদস্যদের কর্মকাণ্ডের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থার বাইরে কার্যকর জবাবদিহি নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা ও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি অযৌক্তিক মামলা দায়ের ও বিনা বিচারের আটক, জামিনযোগ্য হলেও দীর্ঘদিন আটকে রাখা, ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি প্রভাব খাটানো, সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যা মামলায় আসামি করার মতো পুরোনো ধারা বিদ্যমান রয়েছে।
টিআইবি বলছে, গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে (আইসিপিপিইডি) সই করা হয়েছে। গুমের বিষয় তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কমিশন গঠন করা হয়। এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগ দাখিল হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এক হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়। গুমের ঘটনাগুলোয় র্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নাম উল্লেখ করা হয়। গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা একটি মামলায় ১৫ সেনা কর্মকর্তা, আরেকটি মামলায় ১২ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আলামত নষ্টের অভিযোগ সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে না আসার কথা উল্লেখ করেছে টিআইবি। গুম কমিশনের সুপারিশ সত্ত্বেও র্যাব বিলুপ্তি ও গোয়েন্দা বাহিনীর সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকা, টিএফআই বিলুপ্ত না করা, র্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। এনটিএমসি বিলুপ্ত করা হলেও একই ধরনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।
র্যাব বিলুপ্তি ও গোয়েন্দা বাহিনীর সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার দৃশ্যত নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে বৈষম্যমূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সেনা কর্তৃত্বাধীন সেনানিবাসের অভ্যন্তরে সাব জেল বা উপকারাগারে রাখা হয়।
Posted ৭:০৫ এএম | মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।