বিশ্ব ডেস্ক | বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | 6 বার পঠিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও কাজের মধ্যে অসঙ্গতি ক্রমশ বাড়ছে। তিনি প্রচুর কথা বলেন, কিন্তু বাস্তব কার্যক্রমে তার প্রমাণিত পদক্ষেপের অভাব অনেকের চোখে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সম্পর্কিত তার নীতি ও প্রস্তাবগুলো বারবার পরিবর্তিত হয়েছে, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক নাটক বা প্রদর্শনীর মতো মনে হচ্ছে।
ইকোনোমিক টাইমস লিখেছে, ট্রাম্পের এই ধরনের অনিশ্চিত আচরণ শুধু সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যেও সন্দেহ তৈরি করছে। ফলে ট্রাম্পের দেওয়া প্রতিশ্রুতি, প্রস্তাব বা সমাধানের কথায় মানুষ সহজেই বিশ্বাস রাখতে পারছে না। যখন একজন প্রেসিডেন্টের কথার ওপর আস্থা কমে যায়, তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনীতি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্প বারবার নতুন শর্ত বা দাবির কথা উল্লেখ করেছেন, যা অনেক সময় আগের কথার সঙ্গে মিলছে না। এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক বাজার এবং শেয়ারবাজারকেও প্রভাবিত করতে পারে, কারণ প্রেসিডেন্টের বক্তব্য সাধারণত অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ট্রাম্পের এই কৌশল তার রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং সমর্থকদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। একজন নেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। সেটি হারালে তার প্রভাব সীমিত হয়ে যায়।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বার্তা একেবারেই অগোছালো
সিএনএন লিখেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার দশ দিন পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল অস্পষ্ট। এখনও তা সদা পরিবর্তনশীল। অ্যাক্সিওসের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প সময়সীমা ঘোষণা করে তা মুছেও দিয়েছেন। যুদ্ধের সমাপ্তির ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন বা নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুক্তি দিয়েছেন, তাকেই ইরানের নতুন নেতা হিসেবে বেছে নিতে হবে; যদিও তার প্রশাসনই এসব লক্ষ্যকে অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, সন্ত্রাসবাদে তাদের সমর্থন বন্ধ করা এবং তাদের নৌবাহিনীকে পরাজিত করার লক্ষ্যগুলো সুস্পষ্ট। কিন্তু ট্রাম্পের বার্তা আরও বেশি পরিবর্তনশীল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রয়টার্স-ইপসোসকে দেওয়া এক হাজার ২১ জন উত্তরদাতার মধ্যে মাত্র ৩৩ শতাংশ মত দিয়েছেন, ট্রাম্প ইরান অভিযানের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ডেমোক্র্যাট (৯২%) এবং স্বতন্ত্রদের (৭৪%) বিশাল অংশ বলেছেন, লক্ষ্যগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি। একই মত ব্যক্ত করেছেন রিপাবলিকানদের ২৬ শতাংশ।
ট্রাম্পের পরস্পর বিরোধী বার্তা
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস অ্যাক্সিওসকে বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরি তার সমস্ত লক্ষ্য পূরণ করছে বা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য বজায় রাখবে। অথচ ট্রাম্প পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে একাধিক সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, হামলাগুলো প্রায় চার সপ্তাহ স্থায়ী হবে, কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই এগোচ্ছিলেন। ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে বলেছিলেন, ‘আমি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে পুরোটা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারি, অথবা দুই-তিন দিনের মধ্যেই এর অবসান ঘটাতে পারি।’
গত সোমবার ট্রাম্প সিবিএস নিউজকে বলেন, যুদ্ধটি ‘প্রায় পুরোপুরি শেষ’ এবং ‘সামরিক অর্থে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ সেই একই দিনে প্রতিরক্ষা দপ্তর পোস্ট করে, ‘এটা তো সবে শুরু- অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা দমে যাব না।’
সোমবার ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এবং বলেন, ‘আমরা এখনই এটাকে একটি বিরাট সাফল্য বলতে পারি অথবা আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারি। এবং আমরা আরও এগিয়ে যাব।’ তিনি শপথ নেন, ‘এই দীর্ঘদিনের বিপদকে চিরতরে শেষ করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য আগের চেয়ে আরও বেশি দৃঢ়সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাব।’
ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে বলেন, তাকে ব্যক্তিগতভাবে ইরানের পরবর্তী নেতা বাছাইয়ে সাহায্য করতে হবে এবং মোজতবা খামেনি অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু সোমবার তিনি খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে কিনা তা বলতে অস্বীকার করেন। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলবেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও শব্দটি তিনি বলেই চলেছেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য
৩১ মার্চ: ট্রাম্প বলেন, ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপে কিছু দেশ যারা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি, হরমুজে তাদের নিজেদেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিতে হবে। আবার তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করতে রাজি, এমনকি হরমুজ পুরো খুলে না দিলেও। একটি বিবৃতিতে ট্রাম্প আরব দেশগুলোকে যুদ্ধের খরচ ভাগ করে নেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।
৩০ মার্চ: ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের নতুন নেতৃত্ব খুব ইতিবাচকভাবে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনায় আছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছে যুদ্ধ শেষ করার জন্য। ‘যদিও ইরান তা অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প আরেক বক্তব্যে বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি খুব শিগগির হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প বলেন, তিনি যুদ্ধ শেষ করতে চান, এমনকি হরমুজ না খুললেও। এরপর তিনি পুনরায় হরমুজ খুলতে ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নইলে ইরানের জ্বালানি ও তেল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ধ্বংস করা হবে।
২৬ মার্চ: ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের জ্বালানি প্লান্টে হামলা ১০ দিনের জন্য থামানো হয়েছে এবং আলোচনাগুলো ‘ভালো’ চলছে। একই দিনে তিনি বলেন, ইরান যদি চুক্তি না করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও হামলা চালাবে।
২৩ মার্চ: ট্রাম্প বলেন, কয়েকটি বড় পয়েন্টে ইরানের সঙ্গে আলোচনা হয় এবং হামলা কিংবা হামলা স্থগিত নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিভ্রান্তি ছড়াতে চান ট্রাম্প
ট্রাম্পের এর আচরণকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বেশিরভাগ সময় এটি ট্রাম্পের কৌশলগত পদ্ধতি। তিনি বিভ্রান্তি তৈরি করতে এমন বক্তব্য দেন। আবার আলোচনার দিক ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশে সুবিধামতো বক্তব্য দিতে পছন্দ করেন। আবার কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এ ব্যাপারগুলো ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বগত সমস্যা। তবে একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলার কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন গবেষকরা। সবাইকে বিভ্রান্তিতে রেখে ট্রাম্প নিজের মূল্যায়ন বাড়াতে চান। মিডিয়া গেম ট্রাম্পের অন্যতম কৌশল। সবসময় তিনি খবরের শিরোনামে থাকতে চান। তাছাড়া অন্যের ওপর খবরদারি ধরে রাখতেও তিনি একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেন।
Posted ৯:৪৯ এএম | বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।