নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | 343 বার পঠিত

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দুই বছর ধরে যুদ্ধ চলেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপট এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল এক ভিন্ন নীতি গ্রহণ করে। তারা ইরানের প্রক্সিদের সঙ্গে কেবল সংঘর্ষ না করে তাদের নির্মূলের পথে হাঁটা শুরু করে। আজ তিনটি আঞ্চলিক শক্তির আধিপত্য রয়েছে। সবার নিজস্ব আধিপত্য ও নিরাপত্তা বলয় রয়েছে।
ইসরায়েল এখন একটি আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে দাঁড়াবার প্রক্রিয়ায়। দেশটি এখন শুধু নিজস্ব নিরাপত্তার ওপর মনোযোগ দেওয়ার পুরোনো নীতি ত্যাগ করেছে। বর্তমানে এটি কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে সামরিক শক্তিতে বেশি পারঙ্গম।
দ্বিতীয় বিজয়ী হলো তুরস্ক। ইসরায়েল তেহরানের বেশির ভাগ সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল করে দেওয়ার পর ইরানের প্রস্থান ঘটে। ফলে তুরস্ক তার জায়গা করে নেয়। ইরানের পতনের ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা উচ্চাভিলাষী শক্তিগুলোর নজর কেড়েছে এবং এখানে তুরস্ক সিরিয়ার দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের লেভান্ট অঞ্চলসহ বৃহত্তর এলাকাজুড়ে তার প্রভাব হারিয়ে ফেলে। এটি এখন যে আঞ্চলিক গুরুত্ব পাচ্ছে, তা গত এক শতাব্দীতেও দেখা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তুর্কিরা এই অঞ্চলে ফিরে এসেছে এবং প্রকৃতপক্ষে তাই দেখা যাচ্ছে। তবে এবার নতুনরূপে, অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে।
লেবানন, গাজা ও ইরানে তিনটি যুদ্ধের পর ইসরায়েল আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পুনর্জন্ম পেয়েছে। এই সংঘাত এখনও শেষ হয়নি। কারণ ইরান ও ইসরায়েল এখনও তাদের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের অবসান ঘটাতে পারে– এমন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি, যা নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ৭ অক্টোবরের আগের তুলনায় আমাদের ইসরায়েলকে ভিন্নভাবে দেখতে হবে। দেশটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক খেলোয়াড়। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজেই বলেছেন, ‘একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের আবির্ভাব ঘটেছে।’
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি সমীক্ষা অনুসারে, ওয়াশিংটন সমর্থিত ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর কারণে তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন এক আঞ্চলিক শক্তি গড়ে উঠছে– ইসরায়েল, তুরস্ক ও সৌদি আরব। ইরানের নেতৃত্বাধীন অক্ষের পরাজয় এবং সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতনের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং লেবানন, গাজা ও ইরাকে ইরানের প্রক্সিদের দুর্বল হয়ে পড়ার এটি একটি স্বাভাবিক ফল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরাক ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে নিরস্ত্র করুক। বাকি আছে ইরান-সমর্থিত হুতি মিলিশিয়া, যাদের দিন শেষ। কারণ স্থানীয় ইয়েমেনি বাহিনী ইসরায়েলি হামলার পর তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত, যা তাদের আর্থিক সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে।
তিন আঞ্চলিক শক্তির কেন্দ্র ‘পূর্ববর্তী’ ইরান থেকে আলাদা। কারণ তারা এমন মতাদর্শ বহন করে না, যা তারা রপ্তানি করতে চায় অথবা স্নায়ুযুদ্ধকালের যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী বৈশ্বিক শক্তিগুলো সমমনা দেশগুলোতে সমর্থন দিতে তেমনও নয়– এমন শক্তি যা তাদের সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
উত্তর ইরাক ও সিরিয়ায় নিরাপত্তা বলয়ে তুরস্কের স্পষ্ট স্বার্থ জড়িত। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে বিনিয়োগের স্বার্থও রয়েছে। এদিকে ইসরায়েল সিরিয়া থেকে শুরু করে তার নিরাপত্তা সীমানার মানচিত্র পুনর্নির্মাণ করছে। ইসরায়েলের তালমুদিক বা ধর্মীয় দাবি কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক প্রকল্প নয়। বরং এটি পশ্চিম তীর ও গাজাকে আত্মসাৎ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। এটি এখনও কঠিন এক মিশন।
ইসরায়েল তার সীমান্তের ভেতরেই পিছু হটতে পারে, যেমনটি সে ৭০ বছর ধরে করে আসছে। কিন্তু যদি সে আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে কাজ করতে চায়, তাহলে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তি থেকে তার কোনো মুক্তি থাকবে না। এমনকি এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের ব্যাপক বিজয় ও স্বীকৃতি সত্ত্বেও ইসরায়েল জানে, তাদের তৎপরতা স্থায়ী নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বয়ে আনবে না। কেবল ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাধানই তা করতে পারে, যা কয়েক দশক ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি দ্বারা প্রমাণিত। সামরিকভাবে ইসরায়েল তার স্বার্থ ও নীতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রহরী হিসেবে কাজ করে যাবে।
ওয়াশিংটন বিভিন্নভাবে ইসরায়েলকে যে সহায়তা দিয়েছে, দুই বছরের যুদ্ধে তার পরিমাণ আনুমানিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যদিও তা ব্যাপকভাবে ইরাক আক্রমণ এবং যুদ্ধের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, ইসরায়েল এমন এক শক্তি যার পেছনে খরচ করা প্রতিটি ডলার অর্থপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের প্রতি বিদ্বেষী ইরান, হিজবুল্লাহ, হামাস, আসাদ ও হুতিদের ইসরায়েল পরাজিত করেছে। তবে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান না করে এসব বিজয়কে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করা সহজ হবে না
Posted ৫:৩২ পিএম | বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।