জাতীয় ডেস্ক | শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 79 বার পঠিত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় দেশে তেল সংকটের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনে পড়েছে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। শুক্রবার ছুটির দিনেও সড়কে দেখা দেয় যানজট। কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও মজুত শেষ হয়ে সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখা ও মারামারির ঘটনা ঘটছে। সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত স্বাভাবিক রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পরিস্থিতি সামলাতে যানবাহনে তেল বিক্রির কোটা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বিপিসির পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান এবং পরিচালক (মার্কেটিং) মুহাম্মদ আশরাফ হোসেনকে গত বৃহস্পতিবার বদলি করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার রাজধানীতে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় টুকু বলেন, অস্থির হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। সরকার পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। তেল নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক না ছড়াতে আহ্বান এবং বাড়তি তেল মজুত না করতে চালকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
যানভিত্তিক কোটা নির্ধারণ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোটরসাইকেলের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১০ লিটার অকটেন বা পেট্রোল সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বিপিসি। শুক্রবার সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। জিপ ও মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কনটেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল দেওয়া যাবে।
ফিলিং স্টেশনগুলোকে জ্বালানি বিক্রির সময়, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে নগদ স্মারক দিতে বলেছে বিপিসি। একই সঙ্গে পুনরায় জ্বালানি নেওয়ার সময় আগের ক্রয়ের বিল জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ডিলারদের নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ এবং ডিপোতে মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিত জমা দিতে বলেছে সংস্থাটি।
তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ছুটির দিনেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পাম্প থেকে মূল রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে গাড়ির লাইন। ফলে রাস্তায় তৈরি হয়েছে যানজট। গতকাল সন্ধ্যার পর আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে কলেজ গেট পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে কয়েক দফা তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। অপেক্ষায় থাকা উবারের গাড়িচালক মো. হাসান জানান, প্রায় ৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে আরও ৩০টির মতো গাড়ি রয়েছে। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তিনি কয়েকটি ভাড়া হারিয়েছেন।
শুক্রবার বিকেলে মতিঝিলের পাশে করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সোহাগ জানান, ডিপো থেকে আগের তুলনায় তেল কম আসছে। আবার গ্রাহকরা বেশি তেল নিচ্ছেন। যারা আগে ২০০ থেকে ৪০০ টাকার তেল নিতেন, তারা এখন ট্যাঙ্ক ভরে তেল নিচ্ছেন। এ জন্য সংকট দেখা দিয়েছে। পরীবাগের পাম্পে কথা হয় বাইকচালক মইনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, কয়েকটি পাম্প ঘুরে এখানে তেল নিতে এসেছেন।
জেলায় জেলায় সীমিত সরবরাহ
চট্টগ্রাম, রাজশাহী, মেহেরপুর, যশোর, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলায় তেল পাম্পে সীমিত সরবরাহের খবর পাওয়া গেছে। কোথাও মোটরসাইকেলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর গনি বেকারি এলাকার কিউসি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। চালকদের অনেককে ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। মোটরসাইকেলচালক আরমান হোসেন বলেন, এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে মাত্র দুই লিটার তেল পেয়েছি। একই চিত্র দেখা গেছে টাইগারপাস মোড়সহ নগরীর কয়েকটি পাম্পে।
ফেনী শহরের কিছু পাম্পে তেল সংকটের কারণে বিক্রি বন্ধের খবরও পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আতঙ্কে বেশি তেল মজুতের প্রবণতাই মূলত চাহিদা বাড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
রাজশাহী বিভাগে ২৭৯টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। ডিলারদের দাবি, কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
মেহেরপুরে অধিকাংশ পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল পাচ্ছেন ক্রেতারা। অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ রাখতে হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মোটরসাইকেল আরোহীসহ বিভিন্ন যান চালকদের দেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকার জ্বালানি তেল।
শুক্রবার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কমলপুর ভাই ভাই পাম্প ও জগন্নাথপুর মিন্টু মিয়া ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল আরোহীসহ বিভিন্ন যান চালকদের ভিড়। প্রথমে তাদের তেল দিতে রাজি না হলেও পরে ১০০ টাকার তেল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পেট্রোল দেওয়া হয়। দুপুর থেকে বন্ধ হয়ে যায় দুটি পাম্প। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, মজুত কমে যাওয়ায় বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
পাচার ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে যশোর ও হবিগঞ্জ সীমান্তে অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি জোরদার করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বেনাপোলসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন তল্লাশি করা হচ্ছে।
আতঙ্কে কৃষক
জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে কৃষি খাতে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডিজেল না পাওয়ায় বোরো মৌসুমের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
মেহেরপুর সদর উপজেলার উজুলপুর গ্রামের কৃষক ওহিউল ইসলাম জানান, তিনি ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। তাঁর শ্যালো মেশিনের আওতায় প্রায় আড়াইশ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন পাম্প ঘুরেও পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অল্প অল্প করে ডিজেল পেলেও গত দুদিন ধরে একেবারেই পাচ্ছেন না। এতে ধানের জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বোরো মৌসুম দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনের ওপরও। তারা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সেচ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আতঙ্কে বাড়ছে চাহিদা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদাই পরিস্থিতিকে বেশি চাপের মধ্যে ফেলছে। অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, ১-৪ মার্চ ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৯৫ হাজার টন। যেখানে গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৪৫ হাজার টন। অকটেন ও পেট্রোলের বিক্রিও বেড়েছে।
কমছে মজুত
দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মজুত তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের সংরক্ষণ সক্ষমতা ছয় লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। এর মধ্যে ব্যবহারযোগ্য মজুত রয়েছে এক লাখ ৮০ হাজার ৯৪০ টন, যা সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। গত ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ হাজার ৪৭৮ টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। এই হিসাবে বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় সাত দিনের সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব।
পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে শঙ্কার কারণ নেই
বাংলাদেশের চাহিদার প্রায় পুরো পেট্রোল আর অকটেনের সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। এজন্য এই দুই জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হতে নিষেধ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের পেট্রোল আসে মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে চাহিদার তুলনায় কনডেনসেট উৎপাদন অনেক বেশি। এই কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের পরিমাণ দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি। তাই বিপিসি কয়েকবার পেট্রোল রপ্তানির চেষ্টা করলেও মানসম্মত না হওয়ায় সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এই পেট্রোলের সঙ্গে আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়।
দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) ও কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০টি পেট্রোলিয়াম পণ্য– তারপিন, রঙের কাঁচামাল ইত্যাদি তৈরি করে। এদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। আর বাংলাদেশে পেট্রোল ও অকটেন বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন।
জ্বালানি তেলে আইসো অকটেন নামে একটি উপাদানের পরিমাণ যত বেশি হয়, তার মান তত ভালো হয়। দেশে উৎপাদিত যেটিকে পেট্রোলের অকটেন নম্বর সাধারণত ৮০ থেকে ৮৭ হয়। অকটেন নম্বর ৯৫-এর ওপরে হলে তাকে ভালো মানের জ্বালানি তেল বলা হয়। আমাদের দেশে বিক্রীত অকটেনের অকটেন নম্বর ৯৫-এর কম। তাই আমাদের দেশের জ্বালানি তেলের মান কম। এই জ্বালানি ব্যবহারে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় কিছু প্রতিষ্ঠান কনডেনসেট সঠিক পরিশোধন না করেই সরাসরি বিক্রি করে দেয়, যা বাংলা পেট্রোল নামে পরিচিত। অনেক পেট্রোল পাম্প মালিক বিপিসির সরবরাহ করা তেলের সঙ্গে এই বাংলা পেট্রোল যোগ করে বিক্রি করে।
Posted ৫:০৯ পিএম | শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।