খেলাধুলা ডেস্ক | সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 3 বার পঠিত

তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে হোস্টেলে। অবৈতনিক হওয়ায় বাড়ি থেকে অনেক দূরের প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম স্কুলে খই খই সাই মারমাকে ভর্তি করিয়ে দেন কৃষক বাবা ক্যহ্লাখই। ২০১৫ সালে বান্দরবানের লামায় কোয়ান্টাম স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বছরে মাত্র একবার গ্রামের বাড়িতে যেতেন। রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার চুশাক পাড়া দুর্গম অঞ্চল বলে বাজার থেকে ১ ঘণ্টা দূরত্ব হেঁটে বাড়িতে পৌঁছাতে হয় খই খই মারমাকে।
পড়াশোনায় বেশ ভালো খই খই মারমা স্কুলে মজার ছলে টেবিল টেনিস খেলতেন। ৯ ফুট দৈর্ঘ্য, ৫ ফুট প্রস্থ এবং আড়াই ফুট উচ্চতার টেবিলে ছোট্ট খই খই মারমার প্রতিভার ঝলক দেখে মুগ্ধ হতেন কোয়ান্টামের শিক্ষকরা। সেখান থেকে ২০১৯ সালে ঢাকায় ক্যাম্প করে ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের নজর কাড়েন। কয়েক বছরের মধ্যে টেবিল টেনিসের আলোয় নিজেকে আলোকিত করেছেন। গত নভেম্বরে সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে জাবেদ আহমেদের সঙ্গে জুটি বেঁধে মিশ্র দ্বৈতে রুপা জিতে ইতিহাস গড়েন খই খই মারমা। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে টেবিল টেনিসে এটাই বাংলাদেশের বড় কোনো পদক। ১৯ বছর বয়সী এ পাহাড়িকন্যা এখন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলোচিত মুখ। খই খইয়ের স্বপ্নটা আরও বড়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমন কিছু অর্জন করতে চান, যা বাংলাদেশের আর কারও নেই।
একে তো দুর্গম পাহাড়ে বসবাস। তার ওপর পরিবার নিম্নবিত্ত। বাবা ক্যহ্লাখই ও মা মোহ্লাচিং কৃষিকাজ করেন। একমাত্র বড় বোন খেলাধুলায় নেই। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন খই খই মারমা। বিজ্ঞান বিভাগে পড়েন বলে পড়াশোনার চাপটা অনেক বেশি তাঁর। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া এ টেবিল টেনিস তারকা জানান খেলাধুলা এবং পড়াশোনা একসঙ্গে চালাতে কতটা কষ্ট হয়, ‘আমার যেহেতু পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক বেশি ছিল, খেলাধুলার প্রতি অতটা মনোযোগ ছিল না। তবে এখন যেহেতু খেলাধুলা করি, এর সঙ্গে পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়াটা অনেক কষ্টের। যেহেতু আমি বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ছি, সেহেতু কষ্টটা একটু বেশিই। অনেক পড়ালেখা করা লাগে। এরই মধ্যে আমার অনেক খেলা থাকে।’
খই খই মারমার কাছে আপন ভুবন এখন টেবিল টেনিস, ‘আমি যদি খেলায় ভালো করতে থাকি, তাহলে খেলাধুলাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিব। ২০২৮ সালে অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করার চেষ্টা করব। আর পড়ালেখায় মেডিকেল বা ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চেষ্টা করব।’
খই খই মারমার আবেগ-ভালোবাসা টেবিল টেনিসে। অন্য কোনো খেলা তাঁকে টানেনি। নারী হওয়ায় এ পথচলা ছিল অনেক কঠিন। সমাজের বাধাবিপত্তির সঙ্গে কটু কথা শুনতে হয়েছে। তবে নিজের লক্ষ্যের পথে ছিলেন অবিচল, ‘আমি যেহেতু একটা প্রতিষ্ঠানে বড় হয়েছি। সবসময় হোস্টেলে থাকতাম। খেলাধুলা করার কারণে পাড়ার মানুষ বলত খেলাধুলা ছেড়ে পড়ালেখায় ভালো কিছু করতে। যেহেতু আমি খেলাধুলায় জড়িয়ে গেছি, তাই খেলা ছেড়ে দেওয়া অনেক কঠিন। পরে যখন ফেডারেশনে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন অনেক মানুষ বলেছে যতই ভালো করো না কেন টেবিল টেনিসে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তুমি ফুটবল বা ক্রিকেটে নাম দিতে পারতে। আমি যেহেতু এ খেলায় জড়িয়ে গেছি, তাই এটা ছাড়া সম্ভব ছিল না।’
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সিনিয়র ও জুনিয়র বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে সব মিলিয়ে ১০টি স্বর্ণ জিতেছেন খই খই মারমা। গত কয়েক মাসের অর্জনে সম্প্রতি কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। সবকিছু খই খইয়ের কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে, ‘আমাকে এখন অনেকেই চেনে। সেই জন্য খুবই ভালো লাগে। বিভিন্ন ক্রীড়াতে আমার অনেক আইডল আছেন। সবসময় ভাবতাম তাদের মতো হব। তবে কখনও ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি এই পর্যায়ে আসব। সলিডারিটি গেমসে পদক পাওয়ার পর খেলার প্রতি আত্মবিশ্বাসটা আরও বেড়ে যায়। আমি চাইলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব। আত্মবিশ্বাস ছিল বলে ন্যাশনালে সিনিয়র-জুনিয়র বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি। সেখান থেকে কোকো মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড পেলাম। এটা খেলার ব্যাপারে আমাকে আরও অনুপ্রেরণা দেবে এবং আগ্রহ জোগাবে।’
Posted ৪:১০ পিএম | সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।