বিশ্ব ডেস্ক | রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 4 বার পঠিত

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের গর্জনে ভারী। এই যুদ্ধের ময়দানে সবচেয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো। একদিকে ইরানের নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা- এই দুই যাঁতাকলে আটকে গেছে দুবাই, রিয়াদ ও দোহার মতো ঝকঝকে আধুনিক শহরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান এখন জিসিসিভুক্ত প্রায় সব দেশকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে। তেহরান মূলত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার কথা বললেও তার প্রভাব এখন বিস্তৃত। জ্বালানি অবকাঠামো, হোটেল, বিমানবন্দর থেকে আবাসিক এলাকা- কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এ অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো কার্যত এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা তারা শুরু করেনি এবং কখনো চায়নি।
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ফিনান্সিয়াল মার্কেট ও আবুধাবি স্টক এক্সচেঞ্জ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। আঞ্চলিক বাজারগুলোতে বড় ধরনের দরপতন ঘটে; সৌদি আরবের শেয়ারবাজার কয়েক শতাংশ পড়ে যায়, ওমান ও কুয়েতেও লেনদেন ব্যাহত হয়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিদেশি পুঁজি দ্রুত নিরাপদ বাজারে সরে যেতে শুরু করে। পর্যটন ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাই-দোহা থেকে বিদেশি কর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে বুকিং বাতিলের হিড়িক পড়েছে। মূলত, বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলটি যে ‘নিরাপদ স্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত ছিল, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে শুরু করেছে।
উভয় সংকটে আরব রাষ্ট্রগুলো
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আরব দেশগুলো এখন অসম্ভব দুটি পছন্দের মুখোমুখি। হয় তাদের সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে হবে, যা তাদের ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে চিত্রিত করবে; না হয় নিজেদের সাজানো শহর পুড়ে ছাই হতে দেখেও চুপচাপ বসে থাকতে হবে।
যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি অনেক বড়। গত কয়েক দশকে আরবরা মরুভূমিকে যে আধুনিক স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে, তার ভিত্তি হলো বিদেশি বিনিয়োগ ও জ্বালানি সম্পদ। যদিও এসব দেশের হাতে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র রয়েছে, তবুও ভৌগোলিক বাস্তবতা তাদের দুর্বল করে দিয়েছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ফলে যুদ্ধে জড়ালে প্রথম আঘাত আসতে পারে তাদের সংবেদনশীল অবকাঠামোর ওপর।
বৈদ্যুতিক গ্রিড, পানি লবণাক্তমুক্তকরণ কেন্দ্র এবং জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে তা হবে ভয়াবহ। কারণ এই অবকাঠামোর ওপরই নির্ভর করে উপসাগরীয় দেশগুলোর দৈনন্দিন জীবন। তীব্র গরম আর মরুভূমির পরিবেশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও পানি পরিশোধন ছাড়া এসব শহরে বসবাস প্রায় অসম্ভব। ইরানের মাটির নিচের ক্ষেপণাস্ত্রের শহর আর অগণিত প্রক্সিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে এক অন্তহীন সংঘাত, যা এই অঞ্চলের কয়েক প্রজন্মের সমৃদ্ধিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার সীমাবদ্ধতা
আরব দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লালন-পালন করেছে এই বিশ্বাসে যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরায়েলকে বাঁচাতে যতটা তৎপর, আরবদের ওপর আসা হামলা ঠেকাতে ততটাই উদাসীন।
আর উপসাগরের দেশগুলো এ যুদ্ধ চায়নি। যদিও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ইরানে আক্রমণ করতে ওয়াশিংটনে তদবির চালিয়েছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে। তবে হামলার আগের বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করে গেছে।
ইরানের কৌশল
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকেও এসব হামলা শুধু প্রতিশোধ নয়, বরং একটি কৌশলের অংশ। তেহরান জানে যে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে দ্রুত পরাস্ত করা সম্ভব নয়। তাই তারা এমন জায়গায় চাপ তৈরি করছে, যেখানে আঘাত লাগলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধ থামানোর দাবি জোরালো হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও জ্বালানি অবকাঠামো সেই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয় সরু হরমুজ প্রণালী দিয়ে। সেই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা উপসাগরীয় তেল উৎপাদন ব্যাহত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। অর্থাৎ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এই সংঘাতের অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
জ্বালানি যখন রাজনৈতিক অস্ত্র
এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তির পথ কী? কাতার ইতোমধ্যে এক ‘র্যাডিকেল’ বা চরম পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। কাতারএনার্জি তাদের এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করেছে। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি গত শুক্রবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উপসাগরীয় সব দেশ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কাতার। যদি সম্মিলিতভাবে সব আরব দেশ তেল-গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে সুনামি বয়ে যাবে। মুহূর্তেই তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
আল-কাবির বক্তব্য স্পষ্ট, যতক্ষণ না যুদ্ধ পুরোপুরি থামছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ কাতার তাদের কর্মীদের ঝুঁকিতে ফেলে জ্বালানি উৎপাদন চালাবে না।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আরবরা যদি এই জ্বালানি অবরোধের ডাক দেয়, তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হবে। এখানে আরেকটি প্রশ্নও আছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই মিত্র দেশগুলো কি এই জ্বালানি বন্ধের হুমকিকে একটি দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবে?
বাংলাদেশ ও স্বল্পোন্নত দেশের ওপর আঘাত
তবে এই ‘জ্বালানি কার্ড’ ব্যবহারের প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানা স্থবির হয়ে পড়া। শিল্প উৎপাদন তলানিতে ঠেকলে রপ্তানি আয় কমে যাবে এবং লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হবে।
এর ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশে পরিবহন ও কৃষি খরচ আকাশছোঁয়া হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষের কাছে চাল-ডাল কেনা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষমতার লড়াইয়ে বাংলাদেশ সরাসরি জড়িত না থাকলেও, পরোক্ষভাবে এর সবচেয়ে বড় মাসুল গুনতে হবে এদেশের সাধারণ মানুষকে।
Posted ৪:১৮ পিএম | রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।