জাতীয় ডেস্ক | সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 5 বার পঠিত

চট্টগ্রাম নগরের পাশ ঘেঁষে বায়েজিদ বোস্তামী সংযোগ সড়ক। যেটি ফৌজদারহাটের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুক্ত হয়েছে। এই সড়কের শেরশাহ মোড় থেকে তিন কিলোমিটার গেলেই ডানদিকে পাহাড়কে দুই ভাগ করে একটি সড়ক চলে গেছে। এই পথ ধরে গেলেই জঙ্গল সলিমপুর ও আলী নগর।
পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলটি ছিল ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর মুক্ত সাম্রাজ্য। এখানে তাদের কথায় ছিল আইন। এখানকার শত শত পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে এতদিন বাইরের কেউ ঢুকতে পারতেন না। এমন কি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরাও। হামলার মুখে পড়ছিল প্রশাসনের লোকজনও। সর্বশেষ ১৯ জানুয়ারি অভিযানে এক র্যাব সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সোমবার দুপুর দুইটা থেকে সেই ইয়াছিন-রোকনের দুর্গে দুই ঘণ্টা সরেজমিন করেছে সমকাল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতিতে পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে এবার। আগে মোড়ে মোড়ে কোলাহল থাকলেও আজ ছিল সুনশান নীরবতা, আতঙ্ক আর উদ্বেগ।
সোমবার তিন হাজার ২০০ সদস্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে যৌথ বাহিনী সেখানে অভিযানে অংশ নেয়। বিকেল পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেলেও মূলহোতা ইয়াছিন কিংবা রোকনের হদিস পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে র্যাব কর্মকর্তারা। সরকারি পাহাড় কেটে এখানে সাম্রাজ্য গড়ে উঠলেও নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা আছে এখানে। বিদ্যুতের লাইন আছে। পানির জন্য আছে ডিপ টিউবেল। কালভার্ট, ব্রিজ ও ড্রেনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তুলেছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। এতে নিম্ন আয়ের লোকজন এখানে কম ভাড়ায় বসবাসে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেপরোয়াভাবে পাহাড় কেটে হাজার হাজার প্লট তৈরি করে বিক্রি করেছেন সন্ত্রাসী বাহিনী।
সরেজমিন নগরের বায়েজিদ আরেফিন নগর থেকে যে সড়কটি জঙ্গল সলিমপুরে ঢুকেছে সেটি দিয়ে প্রবেশ করে দেখা যায়, আরসিসি ঢালাইয়ের সড়ক। যেটি প্রায় এক কিলোমিটার গিয়ে শেষ হয়েছে। আগে এই প্রবেশ মুখ থেকে ঢুকতে চাইলে ইয়াছিন ও রোকন বাহিনীর জেরার মুখে পড়তে হতো। দেখাতে হতো পরিচয়পত্র। তা না থাকলে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। আধা কিলোমিটার গেলেই একটি বাজার। এখানে একটি চারতলা বিদ্যালয় রয়েছে। নাম এসএম পাইলট প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়। পাশেই বাজার। এখানে সীতাকুণ্ড থানার অস্থায়ী একটি ক্যাম্প রয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এখানে পুলিশ সদস্যরা থাকলেও তাদের কোনো কাজ ছিল না। এখানে ইয়াছিন ও তাদের লোকজন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। স্থানীয় পাঁচজনের সঙ্গে কথা হলেও তারা কেউ নাম বলতে রাজি হননি।
বাজারে বিএনপির একটি কার্যালয়। ১৯ জানুয়ারি এই কার্যালয় উদ্বোধনের দিন বাহিনী প্রধান ইয়াছিনকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালায় র্যাব। এই সময় র্যাব-৭ এর গোয়েন্দা টিমের প্রধান নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ধরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এরপর তাদের পেটানো হয়। মোতালেব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
শহীদুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক যুবক জানান, এই কার্যালয়ে থেকে ওইদিন ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল।
বাজার পার হলেই মাটির প্রশস্ত সড়ক। যেটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। দুইপাশে উঁচু পাহাড়ে বসতি। এক কিলোমিটার যাওয়ার পর লোহারপুল এলাকায় মিলেছে আরেকটি বাজার। এই বাজারের একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিজের পাশে বিদ্যুতের পোলে লাগানো দুইটি সিসিটিভি ক্যামেরা। যেগুলো অপসারণ করছে পুলিশ।
ব্রিজের পাশে মঈনুল ইসলামের মুদি দোকান। তিনি বলেন, ‘দোকানটি তিন মাস আগে তিনি ভাড়া নিয়েছি। ওই এলাকায় বসবাস করা সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের এক সদস্য দোকানগুলোর ভাড়া নেন।’ তবে মূল মালিক তিনি নন বলে জানান। সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কারা লাগিয়েছেন তা তারা জানেন না বলে জানান।
লোহার ব্রিজ পার হয়ে কিছুদূর এগুলে একটি পাহাড়ি ছড়া, সেটির উপর রয়েছে ব্রিজ। ২০১৭ সালে ব্রিজটি নির্মাণ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। ব্রিজটি উদ্বোধন করেছেন স্থানীয় সাবেক এমপি দিদারুল আলম। ব্রিজ পার হতেই চোখে পড়ে পাহাড়ের পাদদেশে একটি মাঠ। পাশে একটি ফলক; যেটিতে লেখা ‘আরাফাত রহমান কোকো প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সামাজিক খেলার মাঠ-আদেশক্রমে নগর কর্তৃপক্ষ।’ তারিখ উল্লেখ আছে, ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর।
সামনে এগুলে পাথরী ঘোনা। এখানেও কয়েকটি দোকান রয়েছে। পাশেই পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে প্যাসিফিক বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এরপর কয়েকশ কিলোমিটার এগুলেই আলী নগর। এখানেও পাহাড়ের পাদদেশ থেকে পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত অসংখ্য হাজার হাজার বসত-বাড়ি, মাদ্রাসা, বিদ্যালয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
Posted ৪:৩০ পিএম | সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।