জাতীয় ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 14 বার পঠিত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। যেগুলোর বেশিরভাগই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো। পোস্টগুলো বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট বর্জন, কেন্দ্র দখল ও আগের রাতে ভোট হওয়া সংক্রান্ত।
অন্যদিকে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত পোস্টেও সামাজিক মাধ্যম সয়লাব। এসব পোস্টের বেশিরভাগেই আঙুলে অমোচনীয় ছবি যুক্ত করা হয়েছে। অনেক ভোটার নিজেদের প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছেন। কেউ আবার আগের নির্বাচনের সঙ্গে এবারের অভিজ্ঞতার তুলনা করেছেন।
ফেসবুকে নিশাত আহমেদ নামে একজন লিখেছেন, ‘১৪তে (২০১৪) আমার দায়িত্ব আরেকজন পালন করেছেন। ১৮তে আগ্রহ নিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে দেখি, লাভ নেই। ২৪শে কেন্দ্রে যাইওনি। সে হিসেবে এবার সুষ্ঠু ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রথম অভিজ্ঞতা।’ প্রথমবার ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা লিখেছেন সামছুর রহমান নামে আরেকজন। তিনি লিখেছেন, ‘যত গুজব ফেসবুকেই… সুন্দর পরিবেশে ভোট হচ্ছে।’
বৃহস্পতিবার সকালে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় এক ঘণ্টা স্ক্রল করে প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত শতাধিক পোস্ট দেখা যায়। বিপরীতে ভোট ঘিরে বিভ্রান্তিকর পোস্টও লক্ষ্য করা গেছে। অনলাইন ভেরিফিকেশন ও মিডিয়া গবেষণা প্লাটফর্ম ‘ডিসমিসল্যাব’ বৃহস্পতিবার দুপুরে জানিয়েছে, সকাল থেকে তারা অন্তত ১০টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় এ সংখ্যা ৩০টি। আর ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির ‘বিবিসি ভেরিফাই’ টিমের শ্রুতি মেনন জানিয়েছেন, গত জানুয়ারি থেকে বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে তিনি নির্বাচনকেন্দ্রিক শতাধিক এআই-জেনারেটেড ভিডিও শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে একটি ভিডিওর ভিউ ৮০ লাখ পর্যন্ত।
বিবিসির লাইভ ব্লগে শ্রতি মেনন লিখেছেন, সর্বাধিক দেখা ভিডিওটিতে একজন সরকারি কর্মকর্তার চরিত্র দেখা যায়। যিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন।
সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনও এআই-জেনারেটেড ভিডিও নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এসব কনটেন্টের বেশিরভাগই সীমান্তের বাইরে থেকে ছড়ানো হচ্ছে। দেশের ভেতরের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাইরের উৎস নিয়ন্ত্রণের উপায় নেই।
বিভিন্ন উৎসের অপতথ্য শনাক্তের পর তা নিজেদের ওয়েবসাইটে সরাসরি প্রকাশ করছে ডিসমিসল্যাব। বেলা সোয়া একটার দিকে একটি পোস্টে তারা জানায়, ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সেনাবাহিনীর নির্বাচনী মহড়ার দৃশ্য যোগ করে ওই ভিডিওটি ছড়ানো হয়।
যশোর-২ আসনে রাতে ভোট সম্পন্ন হয়েছে- এমন দাবি করে ছড়ানো একটি ভিডিও এআই দিয়ে বানানো। ডিসমিসল্যাব লিখেছে, ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিওটিতে কয়েকজন ব্যক্তিকে কাগজে সিল দিতে দেখা যায়। সুক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে তাদের অগোছালোভাবে সিল দিতে দেখা যায়। এছাড়া, বাংলাদেশের নির্বাচনে ব্যালট বাক্স হয় স্বচ্ছ, রঙিন নয়। এআই শনাক্তকরণ টুল ডিপফেক-ও-মিটারের মাধ্যমে যাচাই করলেও এটিকে প্রায় শতভাগ এআই কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের শ্রুতি মেনন লিখেছেন, এই নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এআই-জেনারেটেড রাজনৈতিক কনটেন্টের আধিক্য। এগুলোর নির্মাণশৈলী এতটাই উন্নত যে, প্রথম দেখায় আসল বলে মনে হয়।
ডিসমিসল্যাব তাদের লাইভ ব্লগে অপতথ্য ছড়ানো আরেকটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করেছে। লিখেছে, মধ্যরাতে চকরিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট চুরি চলছে দাবিতে একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, মূল ভিডিওটি অন্তত দুই বছরের পুরনো।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী জসিমের প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন- এরকম একটি দাবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (আইন) মো. ছানাউল্লাহ স্বাক্ষরিত ‘প্রার্থীতা বাতিল সংক্রান্ত’ এক আদেশের ছবিতে জসিম উদ্দিন আহমেদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবিটি সঠিক নয়। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেনও ডিসমিসল্যাবকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ চলছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২ হাজার ২৮ প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। ২৭৩ জন স্বতন্ত্র। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন। তাদের মধ্যে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ৪২ হাজার ৭৭৯, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ এবং পোলিং এজেন্ট ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন।
অপতথ্য ছড়িয়েছে পোলিং এজেন্টদের ঘিরেও। ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুরে ৭ লাখ টাকাসহ বিএনপি সমর্থিত এক পোলিং এজেন্টকে আটক করা হয়েছে এমন দাবিতে একটি ভিডিও সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়েছে। তবে ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, প্রচারিত দাবিটি সঠিক নয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, শরীয়তপুরে ৭ লাখ টাকাসহ জামায়াতের নির্বাচনী কার্যালয় থেকে অভিযান চালিয়ে একজন পোলিং কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই পোলিং কর্মকর্তা একইসঙ্গে জামায়াতের একজন কর্মী। জেলার নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাসের তত্ত্বাবধানে জামায়াতের কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে ওই টাকা উদ্ধার করা হয়। অর্থাৎ,আটক হওয়া ব্যক্তি বিএনপি সমর্থিত পোলিং এজেন্ট নন।
নির্বাচন সংক্রান্ত সঠিক তথ্য জানতে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সিইসি নাসির উদ্দীন। সকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘আমরা সত্য তথ্য দিয়ে অপতথ্য মোকাবিলার কৌশল নিয়েছি। গণমাধ্যমই সেই সত্য তথ্য প্রকাশ করবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চেয়ে প্রথম সারির মিডিয়ার ওপর আমরা বেশি বিশ্বাস রাখি।’
Posted ১২:১০ পিএম | বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।