জাতীয় ডেস্ক | বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 5 বার পঠিত

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার গঠনের ২১ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালী টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন তিনি। এ সময় তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসবেন না।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টিঅ্যান্ডটি মাঠে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসেন প্রধানমন্ত্রী। মঞ্চে ওঠার আগেই তিনি চলে যান মাঠে অপেক্ষমাণ নারীদের কাছে। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হন নারীরা। নানা স্লোগান দেন তারা। পরে পবিত্র কোরআন, বেদ, ত্রিপিটক, বাইবেল পাঠ এবং বিএনপির দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
এ অনুষ্ঠানে ১৭ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন তারেক রহমান। এর পর তিনি ল্যাপটপে একটি বাটন চাপেন এবং সঙ্গে সঙ্গে উপকারভোগীদের কাছে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে চলে যায়। এ সময় তুমুল করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া পরিবারগুলো প্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা ভাতা পাবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশে জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের পেছনে রাখা হলে এবং শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করা না হলে দেশকে কোনোভাবেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, সেই সময় সমগ্র বাংলাদেশে তিনি নারীদের শিক্ষাব্যবস্থা স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই শিক্ষিত নারী সমাজকে আজ আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করতে চাই। তাদের সচ্ছলভাবে গড়ে তুলতে চাই। সরকার গঠনের আগেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে কীভাবে নারীদেরকে আমরা ক্ষমতায়ন করব।’
প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারের কিছু নিয়মনীতি আছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, নিয়মনীতির অংশ হিসেবে প্রথমেই পাইলট প্রকল্প করতে হবে। দেশে ১৪টি জায়গায় এই কাজ শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রায় ৩৭ হাজার নারী অংশগ্রহণ করেছেন। কড়াইল, ভাসানটেক, সাততলা এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমিকভাবে দেশের চার কোটি পরিবারে প্রধান নারী সদস্যের কাছে পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা এই কার্ড নিয়ে যেতে সক্ষম হবো।
তারেক রহমান বলেন, সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। নির্বাচনে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের ওয়াদা দিয়েছিলাম। এক মাসের আগেই আমরা তা পূরণ করতে পেরেছি। সেই জন্য শুকরিয়া আদায় করছি। আজকের দিনটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ, স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন। আপনাদের ভোটে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই আমরা জবাবদিহি করতে বাধ্য।
আগামী মাসে কৃষক কার্ড
তারেক রহমান বলেন, ৩৭ হাজার নারীর কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি। আগামী মাসের মধ্যে আমরা কৃষক ভাইদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দিতে সক্ষম হব। কৃষিঋণ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ করা হয়েছে। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, দেশের পরিবর্তন হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাসহ সমসাময়িক বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশ আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। দেশের মানুষের প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের কাছে অনেক। আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো সময় বেশি লাগতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুরোধ করছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বহু বছর ধরে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা করেছি। আল্লাহর রহমতে আজ সেই দিনটি উপস্থিত, যেদিন আমরা এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। আজকের দিনটি আমার জন্য আবেগঘন। সরকার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন।’
সবার আগে বাংলাদেশ
তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী স্লোগান মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘প্রত্যেকটি নির্বাচনী জনসভায় একটি কথা বক্তব্যের শেষে তুলে ধরতাম। সেই স্লোগানটি দিয়েই বক্তব্য শেষ করতে চাই। স্লোগানটি ছিল– ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন ও সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, এমপি, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিকসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কার্ড পেয়ে উচ্ছ্বসিত নারীরা
আনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম কার্ডটি তুলে দেন কড়াইল এলাকার বাসিন্দা মোছা. পারভিন বেগমের হাতে। এর পর পর্যায়ক্রমে বেগম বাসুদা, বেগম পারভিন, বেগম স্বর্না, বুকনা বেগম, বেগম জোসনা, তাসলিমা আক্তার, বেগম রাশিদা আক্তার, বেগম হোসনা আক্তার, রিনা বেগম, বেগম শামসুন্নাহার, রোকসানা আক্তার, মোসাম্মৎ মারফুজা, বেগম রিনা আক্তার, সুমি খাতুন, আকলিমা বেগম ও মিনারা বেগমের হাতে কার্ড তুলে দেন।
কার্ড পাওয়ার পর অনুভূতি প্রকাশ করেন রিনা বেগম। তিনি জানান, তাঁর তিন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। মেজো ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রিনা বেগম বলেন, ‘জীবনে কল্পনা করিনি কার্ডটি পাব, এটি আমার কাছে স্বপ্নের মতো। এই টাকায় ছেলেমেয়েদের খাতা-কলম, পরিবারের বাজার যেমন– চাল, ডাল, তরিতরকারি কিনতে পারব।’
প্রধানমন্ত্রী বাটনে চাপ দেওয়ার পর তাঁর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বেগম রাশিদা আক্তার বলেন, ‘আমি ভাসানটেক বস্তি থেকে এসেছি। আপনি বাটনে চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে এসেছে। স্বামীর একার আয়ে আমরা চলতে পারি না। এই টাকা দিয়ে আমি কিছুটা হলেও প্রতি মাসে স্বামীর পাশে দাঁড়াতে পারব।’
অন্যান্য জায়গায় ফ্যামিলি কার্ড
পাইলট কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে দেশের ১৩টি জেলা, ১৩ সিটি করপোরেশন ও ১৫টি ওয়ার্ডে মোট ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারে কার্ড বিতরণের এ কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্যে মিরপুরের (আলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি) ৮ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম। রাজবাড়ীর পাংশায় হাবাসপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম ও রাজবাড়ী-২ আসনের এমপি হারুন অর রশিদ বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া পতেঙ্গার ৪১ নম্বর ওয়ার্ড, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের ৮ নম্বর ওয়ার্ড, বান্দরবানের লামার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড, খুলনার খালিশপুরের ১০ নম্বর ওয়ার্ড, বগুড়ার শাখারিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড, নাটোরের লালপুরের ঈশ্বরদী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড, ঠাকুরগাঁও সদরের রহমানপুর ইউনিয়েনের ২ নম্বর ওয়ার্ড ও দিনাজপুরের জয়পুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে নারীদের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হয়। ভোলার আসলামপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, সুনামগঞ্জের কুলঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির চৌধুরী, ভৈরবের শিমুলকান্দি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন।
প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্য কার্ড পাবেন: মির্জা ফখরুল
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রহিমানপুর সম্মিলিত ঈদগাহ আলিম মাদ্রাসা মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কথা রেখেছি। সরকার গঠনের ২২ দিনের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে এসেছি। প্রতিটি পরিবারের প্রধান নারী সদস্য এই কার্ড পাবেন। জেলা প্রশাসকও এই কার্ড পাবেন, আমার স্ত্রীও পাবেন।’ রহিমানপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৮৮ নারীর মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানার সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠান হয়।
নেতৃত্ব ঠিক থাকলে সবই সম্ভব : আমির খসরু
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, এয়ারপোর্ট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠানে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের নারীদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়। পাঁচ হাজার ৫৭৫ নারীর হাতে কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সকালে এ অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার প্রমাণ করেছে, নেতৃত্ব ঠিক থাকলে সবই সম্ভব। সরকারি কর্মকর্তারা নির্দ্বিধায় ও স্বাধীনভাবে কাজ করে হতদরিদ্রদের খুঁজে বের করেছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রমুখ।
Posted ২:২০ পিএম | বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।